ইসলাম শান্তি, উদারতা, মানবতা আর অসাম্প্রদায়িকতার ধর্ম। মহান মানবতাবাদী আদর্শ ও দর্শনের ফলে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্বব্যাপী এ ধর্ম ব্যাপক প্রচার-প্রসার লাভ করে। ইসলামী জীবনাচারে নেই কোনো সংকীর্ণতা, সংঘাত। বরং এতে রয়েছে উদারতার বিশালত্ব আর সমুদয় সৃষ্টির প্রতি অশেষ মমত্ববোধ। ইসলাম মানেই শান্তি। তাই ইসলাম প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে অশান্ত, বিশৃঙ্খল ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ, মরুময় আরবের জেহালত সমাজে সৌহার্দ্যময় পরিবেশ, স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসে। আল্লাহর কিছুসংখ্যক বান্দার ত্যাগ-তিতিক্ষা, কষ্ট-যাতনা আর অক্লান্ত শ্রমে ইসলাম অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে দুনিয়ার অন্যতম বৃহৎ এক জীবনাদর্শে পরিণত হয়।
প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে আমরা এখন কী দেখছি? হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের আলোকিত জনপদ হলো এই দেশ। আবহমানকাল থেকে এই জনপদে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ পারস্পরিক সহমর্মিতা, হৃদ্য ও মমত্ববোধের সঙ্গে সহাবস্থান করে আসছে। জাতি-ধর্ম বা গোষ্ঠীগত পার্থক্যের কারণে এ দেশে কোনো সম্প্রদায় কখনও নিগৃহীত হয়নি। সংখ্যালঘুর তকমা মাখিয়ে কাউকে নির্যাতনের শিকারও করা হয়নি। কিন্তু বড়ই দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়; সুদীর্ঘকালের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুমহান ঐতিহ্যকে ভূলুণ্ঠিত করে আজ এ দেশে যাদের সংখ্যালঘু হিসেবে বলা হচ্ছে, তাদের ওপর নির্মম-নিষ্ঠুর নিষ্পেষণ চালানো হচ্ছে। অথচ ইসলামে সংখ্যালঘুদের মর্যাদা ও অধিকার যথাযথভাবে স্বীকৃত এবং এতে অমুসলিমদের ওপর হামলা, নির্যাতন দূরের কথা; সামান্যতম সাম্প্রদায়িক অপ্রীতিকর কোনো বিষয়েরও স্থান নেই।
ইসলামের সংবিধিবদ্ধ নিয়মকানুন ও বিধিবিধান সংবলিত নির্ভুল ঐশী কিতাব পবিত্র কোরআনকে 'হুদাল্লিল আলামিন' বা 'হুদাল্লিন্নাস', অর্থাৎ বিশ্ববাসীর জন্য পথনির্দেশক বা সমগ্র মানব জাতির জন্য হেদায়েতের গ্রন্থ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই সর্বজনীন-বিশ্বজনীন এ মহাগ্রন্থ থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে এমন কিছু বাণীর উল্লেখ করছি- 'তোমাদের ধর্ম তোমাদের কাছে আর আমার ধর্ম আমার কাছে (১০৯ :৬)।' 'তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে, তারা সবাই ইমান আনয়ন করত। তবে কি তুমি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের ওপর জবরদস্তি করবে? (১০ : ৯৯)'। 'আর তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ডাকে তাদের তোমরা গালি দেবে না। কেননা, তারাও তবে অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে। এভাবে প্রত্যেক জাতির চোখে তাদের কার্যকলাপ শোভন করেছি। তারপর তাদের প্রতিপালকের কাছে তারা ফিরে যাবে। অতঃপর তিনি তাদের কৃতকার্য সম্পর্কে তাদেরকে জানিয়ে দেবেন (৬ :১০৮)।' 'তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর সম্পর্কে সত্য বলো (৪ :১৭১)।' 'আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছি নিয়মকানুন, যা তারা পালন করে। সুতরাং তারা যেন তোমার সঙ্গে এ ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত না হয় (২২ :৬৭)।' 'তোমাদের প্রত্যেকের জন্য শিরআত (আইন) ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তোমাদের এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য। তাই সৎকর্মে তোমরা পারস্পরিক প্রতিযোগিতা করো (৫ :৪৮)।' 'বলো, হে আহলে কিতাব! তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করো না (৫ :৭৭)।'
পবিত্র কোরআনে বিবৃত আল্লাহপাকের উল্লিখিত বাণীসমষ্টির ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, দায়িত্বশীলতা, সহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টিই এসব আয়াতে কারিমায় নির্দেশিত।
ইসলামে কি ধর্মীয় কারণেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সম্পদ আর সল্ফ্ভ্রমের ওপর আক্রমণ বা তাদের বাসস্থানে অগ্নিসংযোগ করার অনুমতি আছে? নিশ্চয়ই না। বরং ইসলামে অন্য সব ধর্ম ও তার অনুসারীদের যথাযথ সম্মান, অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট ও স্বীকৃত। কিন্তু আজ নামধারী মুসলমানরা অমুসলিম নাগরিকদের জন্য এ দেশে আজাব-গজবের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরা কি ইসলামকে আল্লাহপাক ও প্রিয় নবী (সা.)-এর চেয়েও বেশি ভালোবাসে; পছন্দ করে? মহানবী (সা.)-কে তদানীন্তন অমুসলিমরা কত নির্যাতন করেছে! কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী- দয়াল নবী কোনোদিন বদ দোয়া করেননি; প্রতিশোধ নেননি; কাউকে আঘাত করেননি; কারও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেননি।
মহান আল্লাহর বাণী, মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা আর ইসলামের উদারনৈতিক জীবন ব্যবস্থায় অমুসলিমদের জীবন-মালের সার্বিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার সব ধরনের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। ইসলাম পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয় এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির সঙ্গে সবার সহাবস্থান নিশ্চিত করে। এমনকি যে এলাকায় মুসলিম জনগণের সংখ্যা বেশি হবে, সে এলাকায় অমুসলিমদের জীবন ও সম্পদের হেফাজতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে মুসলমানরাই। এটাই ইসলামের শিক্ষা। এ ক্ষেত্রে বিশ্বমানবতার পরম সুহৃদ মহানবী (সা.)-এর একটি কঠোর সতর্কবার্তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, 'মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় সংখ্যালঘু অমুসলিমরা হলো পবিত্র আমানত। কোনো মুসলিম যদি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালায় তাহলে কিয়ামত দিবসে আমি সেই এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে মামলা করব।'
মহানবী (সা.)-এর উল্লিখিত সতর্কবাণীর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি, কোনো প্রকৃত মুসলমান সংখ্যালঘু অমুসলিম নাগরিকদের ওপর কোনো ধরনের অত্যাচার করতে পারে না। যারা মানবতাবিরোধী এসব কাজে লিপ্ত হবে, তারা আর যাই হোক; কখনও মুসলমান হতে পারে না।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন: চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়