ছাত্রী হয়রানির প্রতিবাদ এবং নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনই প্রমাণ করছে- বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস কতটা অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। আমরা উদ্বিগ্ন যে, রোববার পাঁচ তরুণের হাতে এক ছাত্রী যৌন নিপীড়ন ও মারধরের শিকার হলেও নিপীড়নকারীদের এখনও ধরতে পারেনি প্রশাসন। উল্টো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রীদের রাত ১০টায় হলে প্রবেশের নির্দেশ দিয়েছে। আমরা মনে করি, এ ঘটনার সঙ্গে হলে প্রবেশের সময়সীমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পরিসরে একজন ছাত্রের যেমন হলে প্রবেশের সময়সীমা নেই; তেমনি ছাত্রীদেরও সে স্বাধীনতা থাকা উচিত। আমরা জানি, সান্ধ্য আইন নিয়ে এরই মধ্যে আন্দোলন কম হয়নি। এখন হঠাৎ আবার সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
আমরা দেখেছি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এর আগেও ছাত্রী নিপীড়নের মতো ঘটনা ঘটেছে। গত জুন ও এপ্রিলে শাটল ট্রেনে বহিরাগতদের দ্বারা দুই ছাত্রী ধর্ষণচেষ্টার শিকার হওয়ার মতো গুরুতর ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তা ছাড়া গত সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই ছাত্রলীগের চার কর্মীর বিরুদ্ধে দুই ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিতে পারেনি। সেখানে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ সেল থাকলেও তার কাজ কী? সে জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবির প্রথমে সংগত কারণেই রয়েছে যৌন নিপীড়ন সেল বাতিল করে নতুন করে সেল গঠন। শিক্ষার্থীরা চার কর্মদিবসের মধ্যে চলমান ঘটনাগুলোর বিচার ও সুষ্ঠু সমাধানের যে সময়সীমা দিয়েছে, তাও যথার্থ। ছাত্রীদের হলে প্রবেশের ক্ষেত্রে সময়সীমা না রাখা এবং অঘটনগুলোর বিচারে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগও সংগত দাবি।
মন্দের ভালো- শিক্ষার্থীদের দাবি অনুসারে চার কার্যদিবসের মধ্যে যৌন নিপীড়নে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার ঘোষণা এবং ব্যর্থ হলে প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের নিয়ে পদত্যাগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার। এখন আমরা এর কার্যকারিতা দেখতে চাইব। দেখতে চাইব যৌন নিপীড়নে জড়তিদের শাস্তিই নিশ্চিত হয়েছে; প্রক্টরিয়াল বডিকে পদত্যাগ করতে হয়নি। আমরা বিশ্বাস করি, প্রশাসন তৎপর হলে অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হবে না। যেখানে ধারণা করা হচ্ছে, অপরাধীরা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী, সেখানে তাদের শনাক্ত না হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না।
অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগী ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কার্যালয়ে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে গেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি তাঁকে বাধা দেন। এতে সেই বাংলা প্রবাদটি প্রমাণ হয়- 'ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না'! এমনকি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে চবি ছাত্রলীগ সভাপতিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখতে চাইব, অপরাধীদের রাজনৈতিক রং অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণও প্রশাসনের হাতে থাকা চাই। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, পাঁচ বছর ধরে সেখানে হলগুলোতে আসন বরাদ্দ দেওয়া বন্ধ রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়টির হলে থাকতে চাইলে ছাত্রলীগই কেন শেষ ভরসা হবে? প্রশাসন যদি সেখানকার আবাসিক হলের দায়িত্বই পালন করতে না পারে, তবে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করবে!
পরিহাসের বিষয়, সম্প্রতি ছাত্রলীগের সঙ্গে স্থানীয় যুবলীগ নামধারী নেতার অনুসারীদের সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করলেও ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনায় প্রশাসন নির্বিকার। অবশ্য বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে যেভাবে শিক্ষকরা সংহতি জানিয়েছেন, আমরা সেটাকে সাধুবাদ জানাই। আমরা চাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নিরাপদ করে তোলার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের মহাকাব্যিক নির্লিপ্ততার অবসান হোক। পাহাড় ও প্রকৃতিঘেরা এ ক্যাম্পাসে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই ভূমিকা পালন করতে হবে। ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে কেবল সেখানকার শিক্ষার পরিবেশই বিঘ্নিত হবে না; দেশের উচ্চশিক্ষায়ও তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।

বিষয় : সম্পাদকীয় নিরাপত্তাহীনতা

মন্তব্য করুন