সৈয়দ হাসান ইমাম, আমাদের হাসান ভাই- আমার দৃষ্টিতে একজন বিস্ময়কর মানুষ। কারণ, এই মানুষকে দেখে আমাদের কৈশোরকাল কেটেছে। তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতিতে স্বপ্নালোকিত হয়েছিল আমাদের সে-ই স্কুলজীবনের শেষ দিনগুলো।
যে সময়ের কথা বলছি, তখনও আমরা স্কুল ফাইনাল দিইনি। আমাদের সময় সেটা ছিল ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা, ১৯৬২ সাল থেকে শুরু। সেই উত্তাল সময়গুলোতে আমরা চলছিলাম এক অগ্নিগর্ভ পথ ধরে। একদিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্য অব্যাহত সংগ্রাম চলছে তৎকালীন পাকিস্তানে; পূর্ববাংলা সেখানে এক কিংবদন্তিতুল্য অধ্যায়; অন্যদিকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে উৎসারিত যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, তার ধারাবাহিকতায় রচিত হচ্ছে নতুন নতুন নাটক, কবিতা, গান। সে গানে মুক্তির সুর লাগছে। সে নাটকজুড়ে দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার সংলাপ; সেই কবিতার উপমার নাম অবিনশ্বর লড়াই। মানুষের আশ্চর্য উদ্বোধন। 
সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নাটকের যে আন্দোলন ১৯৫৬ থেকে '৬২; যদিও '৫৬ সালের কথা আমার মনে নেই, থাকার কথাও নয়; তারপরও কিছু নাম মনে করলে এখনও কী আশ্চর্য উন্মাদনা তৈরি হয়! বজলুল করিম, মকসেদুল সালেহীন, সৈয়দ হাসান ইমাম, গোলাম মুস্তাফা, আজমেরী জামান মেরী রেশমা, মাসুদ আলী খান, বুলবুল আহমেদ- কত নাম যেন আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে একেকটি রক্তজবা! তখন সেভেন অ্যাগেইনস্ট থিভস, ইডিপাস, রাজা, রক্তকরবী নাটক ঢাকায় মঞ্চস্থ হতো। সে-ই প্রথম গ্রুপ থিয়েটারের শুরু। এই গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্টের সঙ্গে সৈয়দ হাসান ইমাম, গোলাম মুস্তাফাসহ অনেকেই যুক্ত হলেন। এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করলেন নিরলসভাবে। 
আমরা যাঁরা সাংস্কৃতিক কর্মী, সেই উত্তাল ইতিহাসের একটি বিষয় আমাদের খুব প্রাণিত করে। ষাটের দশকের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস আলাদাভাবে পাঠ করলেই আমরা বুঝতে পারি, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন যতটা অগ্রসর হচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধের দিকে; বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলন কিন্তু তার পেছনে নয়, বরং সামনে থেকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সামনে নিজেদের অবস্থানটা আরও দৃঢ় করেছিলেন আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাঁরা নিজস্ব দার্ঢ্যতায় মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি জাতির অফুরান প্রেরণা হয়ে উঠেছিলেন। আমাদের কবিতা তখন স্পর্শ করেছিল অবারিত নীল আকাশ; আমাদের নাটক হয়ে উঠেছিল মাটির ঘ্রাণে মানুষের মুক্তির কথায় পরিপূর্ণ। নাটকের পুরো বিষয়টি যদিও ছিল ড্রামা সার্কেলকে কেন্দ্র করে, তবুও সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় তখন ছোট ছোট সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় থেকে গ্রামে গ্রামে নাটকের যে আন্দোলন তৈরি হতে থাকে, তারই ধারাবাহিকতায় ষাটের দশকেও মফস্বল শহরগুলোতে নাটকের আন্দোলন বেশ জোরদার হয়ে উঠেছিল।
নাটক প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা দরকার, হাসান ভাইরা আমাদের নাটকে যে বিষয়টি নিয়ে এসেছিলেন, তা হলো 'আধুনিকতা'। ১৯৫৬ সালের যে প্রথাগত অভিনয়রীতি, তা থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্তানিসল্যাভস্কির মেথড অবলম্বন করে যে অভিনয় করতে হবে, তা পঞ্চাশের দশকে হাসান ভাইরা ছাড়া আর কেউ ভেবেছিলেন কিনা, আমার জানা নেই।
১৯৬২ সালে, আমি তখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র, যে নাটকটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, তা হলো 'প্রথম পরিচয়'। তখন তো এত বুঝতাম না, কিন্তু আজ বুঝি; সে সময়ের প্রথাগত যাত্রারীতির বাইরে গিয়ে আধুনিকতার কনসেপ্ট নিয়ে অভিনয় করেছিলেন হাসান ভাই। 
চলচ্চিত্রের বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, সে সময়ের চলচ্চিত্রে হাসান ভায়ের অভিনয় আমাদের সেই দুরন্ত কৈশোরকে তুমুল আলোড়িত করেছিল। তিনি তো সুদর্শন ছিলেন, আজও আছেন; সেই সঙ্গে তাঁর অভিনয়জ্ঞানও অসাধারণ। তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো এখনও আমার মনে দাগ কেটে আছে। এখনও মনে হয়, সেই অভিনয়, সেই সংলাপ প্রক্ষেপণ, সেই কণ্ঠের কাজ, সেই চোখের অভিব্যক্তি, হাসির মধ্য দিয়ে অনেক সংলাপ অনায়াসে বলে দেওয়া; প্রতিটি কাজে সৈয়দ হাসান ইমাম অনন্য।
এ কথা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস পাঠমাত্রই বোঝা যায়, ষাটের দশকে আমাদের চলচ্চিত্রে যে পরিবর্তন এসেছিল, তার অনেকটাই হয়েছিল ফরাসি চলচ্চিত্র বিপ্লবের ধারাবাহিকতায়। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সময়ে হাসান ভাই শুধু একজন অভিনেতা হিসেবেই নন; চলচ্চিত্র আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবেও অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। কারণ, চলচ্চিত্র একটি জাতির জন্য অনেক বড় হাতিয়ার।
আমাদের তখন মুক্তিসংগ্রামের সময়। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের নানা দিক তখন ওতপ্রোতভাবে পরিবেশিত হচ্ছে চলচ্চিত্রে। সে সময়ে একটি পরাধীন জাতি হিসেবে আমাদের চলচ্চিত্র যে উচ্চতায় উঠেছিল; শুধু নির্মাণশৈলীতেই নয়, ভাবনার জগতেও হাসান ভাই তার অন্যতম দিকনির্দেশক। 
১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকার যখন রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল, তখন উত্তাল হয়ে ওঠেন আমাদের সংস্কৃতিকর্মীরা। হাসান ভাই তখন রুপালি পর্দা থেকে চলে আসেন জনতার মিছিলে। হয়ে ওঠেন নেতৃত্বের এক অপূর্ব স্মারক। পাকিস্তান সরকারের জারিকৃত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করে বাঙালি জাতি। রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন আমাদের প্রাণের স্পন্দন। সেই স্পন্দনে সৈয়দ হাসান ইমামের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, তাঁর অভিনীত নাটক, তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আমাদের প্রাণিত করেছিল। যে মানুষটিকে রুপালি পর্দায় দেখেছি নায়ক হিসেবে; যে মানুষটিকে মঞ্চে দেখেছি একজন নিষ্ঠাবান মঞ্চকর্মী হিসেবে; সেই মানুষটিকেই আমরা রাজপথে সবার সামনে দেখেছি প্রতিরোধে, সংগ্রামে আর দ্রোহে। 
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনার পক্ষে কাজ করতে গিয়ে আমার অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, একজন মানুষের রাজনৈতিক আদর্শ যেমন জরুরি, তাঁর সাংস্কৃতিক ও শিল্প আদর্শও সমান জরুরি। সৈয়দ হাসান ইমামের মাঝে এ দুটি চেতনা যুগপৎ কাজ করেছে। তাঁকে যেমন মঞ্চাভিনয়ে ব্রতী হতে দেখেছি; তেমনি দেখেছি রাজপথের আন্দোলনে দ্রোহী হতে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআদালতের আন্দোলনে হাসান ভাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি তাঁর আদর্শের প্রশ্নে; যে আদর্শ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আদর্শ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আদর্শ,
সে আদর্শের পক্ষে তিনি ছিলেন অনমনীয়, স্থির ও অবিচল। তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব আমাদের দেশে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এক অনুকরণীয় আদর্শ।   
আজ ২৭ জুলাই, হাসান ভায়ের জন্মদিন। এক সংগ্রাম ও সংস্কৃতিমুখর জীবনের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানাই; অভিবাদন জানাই।         
নাসির উদ্দীন ইউসুফ :মুক্তিযোদ্ধা ও নাট্যব্যক্তিত্ব