ভাবতে গেলে বিস্মিত হতে হয়- মাত্র দুই দশক আগেও ঢাকাই বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ এখনকার মতো 'গোত্রবাদী' ছিল না! আমরা যাঁরা সুদূর মফস্বল থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম; চারপাশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে যোগ দিতে বায়বীয় 'প্রতিপক্ষ' বানিয়ে তার প্রতি যুযুধান হয়ে ওঠার পূর্বশর্ত পালন করতে হতো না তাঁদের। সকাল থেকে সন্ধ্যাবেলা- কলাভবনের 'সমাজ নিরীক্ষা কেন্দ্র' হয়ে শাহবাগের 'উত্থানপর্ব' বা 'মৌলি' ছুঁয়ে সায়েন্সল্যাবের 'স্বদেশচিন্তা সংঘ' দিয়ে শ্যামলীর 'চিন্তা' বেয়ে তোপখানার 'পার্টি অফিস' যেতে দ্বিধা কাজ করত না।
কখন থেকে ঢাকাই বুদ্ধিবৃত্তিতে 'গোত্রবাদ' শুরু হলো? পেছনে তাকিয়ে দেখি- লেখক ও চিন্তাবিদ আহমদ ছফা যে অকালে প্রয়াত হলেন, মোটা দাগে তখন থেকে। তিনি ছিলেন ঢাকার অন্তর্ভুক্তিমূলক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের মূর্ত প্রতীক। বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ডান বাম, পুঁজিপতি প্রলেতারিয়েত- সবার জন্যই তাঁর দ্বার ছিল অবারিত। পরবর্তী সময়ে নদী সুরক্ষা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে উপলব্ধি হয়েছে, ছফা ভাই ছিলেন নদীর মতোই সতত প্রবহমান ও স্বচ্ছতোয়া। তিনি নিজেও যে আক্ষরিক অর্থে একটি নদীর পাড় থেকে উঠে এসেছিলেন; এই 'নদী-স্বভাব' কি তারই প্রভাব?
২০০১ সালের ২৮ জুলাই বর্ষণমুখর দিনে ছফা ভাইয়ের তিরোধানের পরপরই তাঁর জন্মভূমি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে গিয়েছিলাম। বলতে গেলে বাড়ির উঠোন ঘেঁষে ধীর লয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট পাহাড়ি নদী। দাপ্তরিক নাম বরুমতি; স্থানীয়রা বলেন 'বরগুইনি'। ফিরে এসে পাক্ষিক 'চিন্তা' পত্রিকায় লিখেছিলাম- 'বরগুইনি পাড়ের আহমদ ছফা'। নদীটিতে ছফা ভাইয়ের মাছ ধরার নানা কাণ্ড ওই এলাকায় গল্প হয়ে আছে।
আহমদ ছফা 'সূর্য তুমি সাথী' উপন্যাসে লিখেছেন- 'এই বরগুইনিতে তিরতির ধারার একটা প্রবাহ ছিল। বর্ষার পানি খ্যাপা, বাদ্যানির মতো মাঠে মাঠে খেলা করত। এখন স্রোতহীন, প্রবাহহীন বরগুইনি অনন্ত তৃষ্ণার একখানি লকলকে জিহ্বার মতো লোকালয়গুলোকে জড়িয়ে পেঁচিয়ে পড়ে আছে। এখন তার বুকে রেতি বালুচর খচখচ করে।'
সেবারই সাতবাড়িয়া থেকে গাছবাড়িয়া গ্রামের দিকে হাঁটছিলাম, বরগুইনির পাড় ধরে। একজনের সঙ্গে দেখা, স্থানীয় গণ্যমান্য। কৌতূহলবশত জানতে চেয়েছিলাম, ওই অঞ্চলে ছফা ভাইয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান কী? বললেন- 'আগে জানন ফরিব আহমদ ছফা খোন ফাডি গরে।' আহমদ ছফার রাজনৈতিক বিশ্বাস না জেনেই তাঁর সম্পর্কে বলব কেন? রাজনৈতিক চশমা দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তি দেখার কায়দা এখন চন্দনাইশ থেকে ঢাকায় এসে জেঁকে বসেছে।
নদনদীর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষিত নিয়েও ছফা ভাই সচেতন ছিলেন। একাধিক নিবন্ধও লিখেছিলেন। ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চে (১৬ মে ১৯৭৬) অংশগ্রহণকারী ছফা ভাই মওলানা ভাসানীর নাম দিয়েছিলেন 'জলদেবতা'। আর ফারাক্কা ব্যারাজের নাম 'জলজল্লাদ'। এও মনে করতেন, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে ফারাক্কা ব্যারাজ ইস্যুতে বাংলাদেশের অধিকারে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেন না। এ প্রসঙ্গে কবি ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার লিখেছেন- 'মওলানার ভাবশিষ্য হিশাবে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণকে পানির অভাবে হাহাকার করে আর পুড়ে মরতে দিতেন না, এই হলো কথা' (প্রাণ ও প্রকৃতি/ আগামী প্রকাশনী/ ফেব্রুয়ারি ২০১১)।
ছফা ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ দেখা ২০০১ সালে, মে মাসের শেষ বা জুনের প্রথম সপ্তাহে। তার আগে, এপ্রিলে, কুড়িগ্রামের রৌমারীতে বিএসএফ-বিডিআর-জনতা সংঘর্ষ হয়েছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাবে 'পাক্ষিক চিন্তা' আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি ছিলেন সূচনা বক্তা। মনে আছে, শুরু করেছিলেন এভাবে- ব্যক্তির মতো সরকার ও রাষ্ট্রেরও 'কার্টেসি' থাকতে হয়। সেটা ভাঙার পরিণতি ভালো হয় না।
সভা শেষে ছফা ভাইকে ধরলাম- রাষ্ট্রের সৌজন্যবোধ কীভাবে প্রদর্শিত হবে। তিনি স্বভাবমতো চোখ ও মুখ সরু করে একটু তাকিয়ে থেকে বললেন- যত ছোটই হোক, প্রতিবেশীর সীমারেখা লঙ্ঘন করবে না। প্রেস ক্লাবের ওই সভা ছিল জনপরিসরে ছফা ভাইয়ের সম্ভবত শেষ উপস্থিতি। দুই-এক দিন পর অসুস্থ হয়ে কমিউনিটি হাসপাতালে ভর্তি হন। ডা. কামরুজ্জামান তাঁকে 'আটক রেখে' চিকিৎসা সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি চিকিৎসার 'ভয়ে' হাসপাতাল থেকে 'পালিয়ে' আসেন। বাসায় এসে ফের অসুস্থ; হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু।
২০১৬ সালের জুন মাসে বান্দরবান থেকে ফেরার পথে চন্দনাইশে ছফা ভাইয়ের স্মৃতি মনে করে ফের দাঁড়িয়েছিলাম বরগুইনি নদীর পাশে। ততদিনে নদীটি আরও শীর্ণকায়। সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রিভারাইন পিপলের সহযোদ্ধা সুদীপ্ত শর্মা। তিনি তো প্রথমে বিশ্বাসই করলেন না- এটি নদী। স্থানীয় সজীব ধর এসে উদ্ধার করলেন- 'হ, ইয়ান তো বরগুইনি নদী।'
বরগুইনির মতো ঢাকাই বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎও শুকিয়ে শীর্ণকায় এখন। ছফা ভাই বেঁচে থাকলে এবং এই গোত্রবাদী পরিস্থিতি দেখে হয়তো বলতেন- বুদ্ধিবৃত্তিরও 'কার্টেসি' থাকতে হয়। সেটা ভাঙার কারণেই এই জীর্ণ ও শীর্ণ দশা।
শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
skrokon@gmail.com