বর্তমান সময়ের যে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ভবন, আবাসিক ভবন কিংবা অন্যান্য স্থাপনা ১৫-২০ বছর আগের স্থাপনাগুলোর তুলনায় বেশি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও কার্যকর। এখন আমাদের কাজের খাত বেড়েছে, কাজও বেড়েছে। এখন আমাদের শহর ঘুমায় না। কোনো না কোনো কলকারখানা বা প্রতিষ্ঠান চলে। এই গতিময় জীবনযাত্রা পরিচালনা ও রক্ষায় যাঁরা জড়িত, তাঁদের জন্য যদি আমরা সুরক্ষা তৈরি না করতে পারি; সেটা যেমন অন্যায্য, তেমন দুঃখজনক। নিরাপদ কর্মক্ষেত্র ও নিরাপদ জীবন সময়ের দাবি।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন ও বিস্ম্ফোরণ, নারায়ণগঞ্জের সেজান জুস কারখানায় আগুন, মিরপুর এলাকায় নির্মাণাধীন কালশী ফ্লাইওভার থেকে পড়ে নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু- এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে মাঝেমধ্যেই। এ ধরনের সংকটে ফ্রন্টলাইন ফায়ার ফাইটাররাও হতাহত হচ্ছেন। হতাহতের ঘটনা মানুষের জীবনকে তছনছ করে দেয়; সঙ্গে তাঁর পরিবারকেও। নিহত হলে তাঁর পরিবার আপনজন ও অবলম্বন হারায়; আহত হলে তিনি হয়ে যান সমাজ ও পরিবারের বোঝা। এসব অঘটন জীবনের তিক্ত বাস্তবতা। এর প্রতিকার দুরূহ; তবে প্রতিরোধ বা উপশম সম্ভব।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস আজ আধুনিক যন্ত্রপাতি ও যানে সমৃদ্ধ। তবে সক্ষমতা ও দক্ষতার বিষয়টি আসলে আপেক্ষিক। প্রযুক্তি ও প্রকৌশল আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক হচ্ছে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা আমাদের অব্যাহত আছে। একই সঙ্গে যাঁরা ফ্রন্টলাইন ফায়ার ফাইটার; তাঁদের বেতন ও সুবিধা প্রান্তিক পর্যায়ের। এ ক্ষেত্রে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। বস্তুত ফায়ার ফাইটার ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকালে যাঁরা জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ করেন, তাঁদের বাস্তবতাও অভিন্ন। আইন ও নীতিমালা করে এসব ফ্রন্টলাইনারের জন্য ঝুঁকি ভাতা এবং দায়িত্ব পালনকালে হতাহত হলে এককালীন আনুতোষিক প্রদানসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সার্বিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থলে কর্মীদের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হবে। লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স বা দায় বীমা উন্নত বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও বাধ্যতামূলকভাবে অনুসৃত একটি ব্যবস্থা। এটির ফলে একটি প্রতিষ্ঠান তার কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে যেমন পদ্ধতিগতভাবে বাধ্য থাকে; তেমনি দুর্ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগী নিজে বা তাঁর পরিবার আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায়। একটি বীমাকৃত পক্ষ যদি দায়ী হয়, তবে দায়বদ্ধতা বীমা পলিসি যে কোনো আইনি খরচ এবং পে আউট কভার করে।

ইচ্ছাকৃত ক্ষতি এবং চুক্তিভিত্তিক দায়গুলো সাধারণত দায় বীমা পলিসিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। দায় বীমার প্রকারভেদ হচ্ছে ব্যক্তিগত দায়; শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ এবং বাণিজ্যিক দায়। এটি অন্যান্য ধরনের বীমা থেকে ভিন্ন। এটি তৃতীয় পক্ষকে (ক্ষতিগ্রস্ত) অর্থ প্রদান করে; পলিসিধারীদের নয়। যার কারণে যখনই একটি প্রতিষ্ঠান বীমা করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তখনই বীমা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির কার্যপ্রকরণ ও কার্যক্ষেত্র ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে একটি মান-পর্যায় নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং এর প্রভাবকে উপশম করার বিষয়গুলো ত্বরান্বিত হয়। সুতরাং আমাদের দেশেও লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স সিস্টেম স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে চালু করতে হবে।

'মার্কেট ফোর্স' বলে অর্থনীতিতে একটা তত্ত্ব আছে। আপনি যখন ইন্স্যুরেন্স শিল্পকে যথাযথভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আইন ও নীতির ওপর জোরারোপ করবেন, তখন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিরও জবাবদিহি থাকবে। এমনকি আইন ও নীতির ব্যত্যয় ঘটলে তাদের অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধিবিধান থাকবে। ফলে তারাও তাদের কর্মকাণ্ডে সচেতন ও আন্তরিক হবে। বাংলাদেশের কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইন্স্যুরেন্স ছাড়া পরিচালনা করা যাবে না- এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তর নিয়ে দুটি কথা না বললেই নয়। প্রতিষ্ঠানটি চলছে পাকিস্তান আমলের আইনের ওপর ভিত্তি করে। এই প্রতিষ্ঠানের জনবল ও জনদক্ষতা দুটিই প্রান্তিক পর্যায়ের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক ও শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠান যেন খাপ খাওয়াতে পারছে না। দক্ষতা ও জনবল বৃদ্ধির পাশাপাশি বিস্ম্ফোরক অধিদপ্তরের কার্যপরিধি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি সময়ের দাবি। প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা যত বৃদ্ধি পাবে, দেশের অগ্নিজনিত দুর্ঘটনা তত হ্রাস পাবে।

দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সবার আগে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাকে ডিজিটাল সার্ভিলেন্স ও কো-অর্ডিনেশনের আওতায় আনা দরকার। আমাদের দেশের ওয়্যারলেস সিস্টেম খুবই নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে। তবে এই সিস্টেমের বহুমাত্রিক উপযোগিতা পাওয়া সম্ভব। যেমন দেশের সরকারি ও বেসরকারি সব অ্যাম্বুলেন্সকে একটি প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা যায়। প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে একটি লোকেশন ট্র্যাকার (জিপিএস) এবং একটি ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন স্থাপন করা যেতে পারে। আমাদের জাতীয় জরুরি সেবা যোগাযোগ নম্বর ৯৯৯। সেখান থেকেই মূল সমন্বয় হতে পারে।

যদি কোনো ভিকটিম ৯৯৯-এ ফোন করে দুর্ঘটনার কারণে অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা চান, তাহলে তাঁর ফোন ট্র্যাক করে এবং তাঁর সর্বনিকটে অবস্থানরত ফ্রি অ্যাম্বুলেন্সকে জিপিএসের মাধ্যমে শনাক্ত করে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর নির্দেশ প্রদান করা যেতে পারে। এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে পারলে দুর্ঘটনাজনিত চূড়ান্ত ক্ষতির হার কমানো অবশ্যই সম্ভব হবে।

রাশেক রহমান: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য