ভারত ২২ জুলাই তার প্রত্যাশিত প্রথম আদিবাসী রাষ্ট্রপতি পেয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স-এনডিএর প্রার্থী দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দলের প্রার্থী যশবন্ত সিনহাকে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি হন। শিবসেনা, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সদস্যরা ছাড়াও বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্য সদস্য তাঁর পক্ষে ভোট দেন। ফলে তিনি যত ভোটে বিজয়ী হবেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি ভোটে জয়ী হয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি হন। বিজেপিকে ধন্যবাদ দিতে হবে এ জন্য যে, দলটি একজন আদিবাসীকে ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছে, যা ৭৫ বছরের ইতিহাসে অন্য কেউ করেনি। যদিও তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়া নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উঠেছে।
মুর্মুর রাষ্ট্রপতি হওয়ার মাধ্যমে ভারতে কি আদিবাসীদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে, নাকি তিনি সদ্যসাবেক রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের মতো আরেকজন 'পুতুল' হিসেবে কাজ করবেন? কোবিন্দ এসেছিলেন দলিত জনগোষ্ঠী থেকে। কিন্তু তিনি কখনোই প্রাথমিক পরিচয় হিসেবে বিজেপির স্বার্থের কথা ভোলেননি। তাঁর দপ্তরকে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পর্যবেক্ষণে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি ভারতের অপর দলিত রাষ্ট্রপতি কে.আর. নারায়ণনের মতো ছিলেন না। নারায়ণন সংবেদনশীল বিষয়াদিতে প্রায়শ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেন। অথচ কোবিন্দ তাঁর দপ্তরের স্বাধীনতার বিষয়টি প্রদর্শন করতে পারেননি। তাঁর সময়ে রাষ্ট্রপতি ভবন ছিল অনেকটা নিষ্প্রাণ।
দ্রৌপদী মুর্মু কি কোবিন্দের পথেই হাঁটবেন? সময়ই সেটা বলবে। তবে ঝাড়খণ্ডের গভর্নর হিসেবে ছোটনগর ও সাঁওতাল পরগনার বিতর্কিত বিলের রেকর্ড বলছে, তিনি কোবিন্দ থেকে নিজেকে ভিন্ন প্রমাণ করতে পারবেন। তবে মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি নিশ্চিতভাবেই তাঁর রাষ্ট্রপতির পদ ব্যবহার করে বিশেষ করে আদিবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণ করতে চাইবে। প্রথা অনুসারে বিজেপি ইতোমধ্যে ভারতের এক লাখ গ্রামে মুর্মুর বিজয় উদযাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
গত আট বছরেরও অধিক সময়ে বিজেপি রাজনৈতিক নানা হিসাব কষছে। দলটি ভোটের হিসাব মাথায় নিয়ে সাংবিধানিক পদগুলোতে লোক বসাচ্ছে। সাঁওতালি আদিবাসী দ্রৌপদী মুর্মুকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচনের মাধ্যমে বিজেপি সাঁওতালি সমাজে হেমান্ত সরেনের নেতৃত্বাধীন ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চাকে টেক্কা দিতে চাইছে। রাজ্য নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
আদিবাসী বুদ্ধিজীবী ও অ্যাক্টিভিস্টরা দ্রৌপদী মুর্মুকে রাষ্ট্রপতি করার বিজেপির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তাঁরা বিশ্বাস করেন, আদিবাসীদের একজনকে সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের সম্মান ও ন্যায্যতার প্রশ্নের সমাধান হবে না। অধিকন্তু, তাঁরা বলছেন, বিজেপি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারীদের মর্যাদা বাড়ালেও দলটি একই সঙ্গে তাদের টেকসই ক্ষমতায়নকে অগ্রাহ্য করেছে।
'মুর্মু নিজ হাতে একটি মন্দির ঝাড়ূ দিচ্ছেন, এমন দৃশ্য বিজেপি দেখিয়েছে। ছবিতে হিন্দু দেবতাদের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিজেপি প্রত্যাশা করছে, আদিবাসীরা সম্পূর্ণভাবে হিন্দু মতাবলম্বী হোক এবং হিন্দুত্ববাদ গ্রহণ করুক। এর মাধ্যমে আদিবাসীদের মধ্যকার বিশ্বাসের বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা হয়েছে।' ঝাড়খণ্ডের গড্ডা কলেজের শিক্ষক রজনী মুর্মু এ কথা বলেন, যিনি অনেক বছর ধরে আদিবাসী বিষয়ে সোচ্চার। রজনী মুর্মুর মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন, আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাস গ্রহণ করা এবং স্বীকৃতি দেওয়ার পরিবর্তে বিজেপি ও সংঘ পরিবার হিন্দুত্ববাদের মধ্যে আবদ্ধ করতে চাইছে। এর মাধ্যমে তাদের সম্মানহানি ও স্বাধীনতা খর্ব হবে। আদিবাসীদের এমন উঁচু পদে বসানোর মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী দল চাইছে আদিবাসী নেতৃত্বকে বশে আনতে।
যারা আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করছে, তারা যুক্তি দিয়ে তুলে ধরছে, বিজেপি যখন তারই মনোনীত রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে অভিনন্দন জানাচ্ছে, তার মানে তাদের সরকার আদিবাসীদের দ্বারা পরিচালিত স্বতন্ত্র আন্দোলনকে আঘাত করছে বা অস্বীকার করছে। ফাদার স্টেন স্বামী (অভিযোগ, জেলে থাকা অবস্থায় চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন) কিংবা সুধা ভরদ্বাজ বা সুরেন্দ্র গেডলিংয়ের মতো মানুষ যাঁরা তাঁদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে, তাঁদের এলগার পরিষদ মামলায় সন্ত্রাসবাদের অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়। আদিবাসী কর্মীরা আরও কিছু উদাহরণ তুলে ধরেছেন, যেখানে নির্দোষ আদিবাসীদের ভুয়া এনকাউন্টারে হত্যা করা হয়েছে এবং মাওবাদী বলে তাদের অসত্য পরিচয় দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে তাঁরা দেখিয়েছেন, বিজেপি সরকার কীভাবে কেন্দ্র ও রাজ্য পর্যায়ে আদিবাসী নেতৃত্বাধীন ঝাড়খণ্ডের পাথালগড়ি আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক ছত্তিশগড়ের সিলগার আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করেছে। একইভাবে আদিবাসী কর্মীরা আরও কিছু উদাহরণ সামনে এনেছে, যেখানে নরেন্দ্র মোদি সরকার বন অধিকার আইন এবং পঞ্চায়েত আইনের মতো কিছু আইন বাতিল করছে, যে আইনগুলোর মাধ্যমে আদিবাসীরা কিছু স্বায়ত্তশাসন লাভ করেছে এবং তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বেসরকারীকরণের ওপর কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে চাপ দিচ্ছে তাতে আদিবাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বেড়েছে। ফলে ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড কিংবা উড়িষ্যার মতো রাজ্যগুলোর আদিবাসী ভূমিতে খনিজ পদার্থ আহরণ শঙ্কায় পড়ছে। খনি ও খনিজসংক্রান্ত মাইন অ্যান্ড মিনারেল (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেশন) আইনে আহরণ ক্ষমতা কমানোর মাধ্যমে বোঝা যায়, বিজেপির আদিবাসী বিষয়ে বক্তৃতা এবং বাস্তবতায় ফারাক।
ঝাড়খণ্ড কমিশন ফর উইম্যানের সাবেক সদস্য বাসাবি কিরো মুর্মুর রাষ্ট্রপতি হওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতে উপজাতিদের বাস্তবতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, 'আদিবাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো এখন অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা ও ম্যালেরিয়া রোগপ্রবণ এলাকা। এটা অকল্পনীয়, প্রায় ৭০ শতাংশ আদিবাসী নারীই রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন এবং অনেক শিশুই তাদের পঞ্চম জন্মদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে না। ভারতে প্রতি বছর দেড় লাখের অধিক আদিবাসী ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুবরণ করে।' তিনি আরও বলেন, 'ভারতের আদিবাসীদের অবস্থা অপ্রকাশিত। আদিবাসী নারীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার মাত্র ৩৪ শতাংশ। আর আদিবাসী পুরুষদের সাক্ষরতা ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ ভারতের জাতীয় সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় দ্রৌপদী মুর্মু কাঁটার মুকুট পরিধান করছেন'।
তারপরও বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দ্রৌপদী মুর্মুকে মনোনয়ন দিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার ও বিজেপি আদিবাসীদের প্রতি প্রত্যাশিত সম্মান প্রদর্শন করেছে। এখন দেখার বিষয়, তাঁরা মুর্মুকে তাঁর স্বাধীনতা দেন কিনা।
অজয় আশীর্বাদ মহাপ্রশস্ত: ভারতীয় সাংবাদিক; দ্য ওয়্যার ডট ইন থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক