জন স্টুয়ার্ট মিল 'টাইর‌্যানি অব মেজরিটি' এবং এর বিপদের কথা বলেছিলেন। 'টাইর‌্যানি অব মেজরিটি', অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বা ধর্মগোষ্ঠী বা বর্ণগোষ্ঠী তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও বিভেদের রাষ্ট্রীয় নীতি দিয়ে একটি সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। সমাজের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়তে পারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ মানুষের ইতিহাসের নানা সময়ের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কারণে সংখ্যালঘু সুরক্ষা, বহুত্ববাদী সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে 'সেক্যুলারিজম', মানবাধিকার ও উদার মানবিক বোধ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি সারা বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষ উপলব্ধি করেছেন।
এই উপলব্ধির কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই বিশ্ব শান্তি রক্ষায় জাতিসংঘ গঠিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর গৃহীত হয়েছে সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা এবং ১৯৪৯ সালে গৃহীত হয়েছে চার-চারটি আইসিআরসি জেনেভা কনভেনশন। সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা ও চারটি আইসিআরসি জেনেভা কনভেনশন মানবাধিকার (হিউম্যান রাইটস) ও মানবিক (হিউম্যানিটারিয়ান) অধিকারকে সর্বজনীন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছে। এতে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে নিরপরাধ মানুষ, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সিভিল স্থাপনা, তৃতীয় পক্ষ, নারী-শিশু-বৃদ্ধ ও যুদ্ধবন্দিদের সুরক্ষার ব্যাপারে যুদ্ধরত রাষ্ট্র বা পক্ষগুলোর দায় ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
এত কিছুর পরও অবশ্য যুদ্ধ, দেশ দখল, সহিংসতা এবং ধর্ম-বর্ণভিত্তিক হানাহানি থেমে নেই। করোনাভাইরাস মহামারির পরে শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যার প্রভাবে সারাবিশ্বে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। বাংলাদেশেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ম্ফীতি, তেল ও বিদ্যুতের সংকট নানা উৎকণ্ঠা তৈরি করছে। তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বিরোধ ঘাড়ের ওপর গরম নিঃশ্বাস ফেলছে। তবে এটা মানতে হবে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর জনমানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বহুত্ববাদী সমাজের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, 'সেক্যুলারিজম', জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে লৈঙ্গিক সমতা, মানবাধিকার, সংখ্যালঘুর সুরক্ষা, বিরুদ্ধ মতবাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও উদার মানবিক বোধের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলেন। রাষ্ট্র্রীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই এ নীতিগুলোর চর্চাও হয়েছিল।
কিন্তু দশক দুই ধরে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত, ফিলিপাইন, আফগানিস্তানসহ অনেক রাষ্ট্রে ধর্ম বা বর্ণের নামে জনপ্রিয় নেতা বা রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় এমন পরিস্থিতি কায়েম করা হচ্ছে, যাতে সংখ্যালঘু সুরক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, উদার মানবিক বোধ ও পরমত বা ধর্ম ও বর্ণ সহিষুষ্ণতা সংকুচিত হচ্ছে বা হুমকির মুখে পড়েছে। আধুনিক গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র নিজেদের মধ্যকার তাত্ত্বিক বিতর্ক, পাল্টাপাল্টি রাষ্ট্র ব্যবস্থা, ঠান্ডা যুদ্ধ ও পারস্পরিক সহিংস দ্বৈরথ সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার সমন্বয়ে 'সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ওয়েলফেয়ার স্টেট'-এর ধারণা বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রিয়াসহ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির দেশগুলো প্রত্যেক মানুষের জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, পুলিশি, বিচারিক সেবা, শতভাগ কর্মসংস্থানসহ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়েছে। শুধু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যই নয়, তারা তাদের দেশে গড়ে তুলেছে সভ্য ও মানবিক ফৌজদারি ন্যায়বিচার ব্যবস্থা। যেখানে মৃত্যুদণ্ড রদ করা হয়েছে, যেখানে কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তাঁকে কারাগারে না পাঠিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়।
পশ্চিম ইউরোপ, ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ভারসাম্যপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের হাত ধরে বৈশ্বিকভাবেই গড়ে ওঠা ধারণাগুলো হচ্ছে- পরমত সহিষুষ্ণতা, চিন্তা করা ও কথা বলার স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ইহজাগতিকতা (বাংলাদেশে এর অর্থ করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা) ও নানা ধর্ম-বর্ণের সমাজ বা রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এর বেশ কয়েকটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও ভিত্তি। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে যা হচ্ছে, সেটি বেশ ভয়ংকর!
রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষজনের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও সেখানকার বুড্ডিস্ট চরমপন্থিরা রাখাইনের মুসলিমদের হত্যা শুরু করলে বাংলাদেশকে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দিতে হয়। ভারতে নাগরিক আইন এমনভাবে সংশোধন করা হলো- পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে যেসব মুসলমান নানা সময়ে ভারতে ঢুকে সেখানকার নাগরিক হিসেবে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, তাঁদের ভারত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া যায়। এদিকে মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর জঙ্গি তালেবান পুরো দেশ দখল করে সেখানে তাদের সরকার কায়েম করে ফেলল।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় চরমপন্থার যে বাড়বাড়ন্ত, সেটি আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার। রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলিমদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো না গেলে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, পাকিস্তানসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মদ এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে সাবধান করেছেন। বাংলাদেশে গত বছর দুর্গাপূজার সময়ে জেলায় জেলায় পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে।
ফেসবুকে এক হিন্দু ছাত্রের পোস্টকে কেন্দ্র করে নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানো হয় গত ১৮ জুন। এর কয়েক দিন পরে হত্যা করা হয় আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে। এর আগে মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে ধর্ম নিয়ে মন্তব্য করার দায়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল। ঘটনাগুলো কী বার্তা দিচ্ছে? দায়টি কার? ধর্মান্ধ নির্বোধ জনগোষ্ঠীর নাকি 'ট্যাইরানি অব মেজরিটি'র? সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা ও সংস্কৃতি কি এর দায় এড়াতে পারে? নাকি সব কালে জনগোষ্ঠীর একটি অংশ অথবা কোনো কোনো সময় জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশের মধ্যে সংস্কারজাত বা ধর্মান্ধতাজাত কিছু আদিম অন্ধকার থাকে এবং প্রজন্ম পরম্পরায় মস্তিস্কের মূল প্রকোষ্ঠে থেকে যায় সেই অন্ধকার? তা যদি না হবে, তাহলে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে আমরা যে ধর্মান্ধতা ও হিন্দু-মুসলিমের ধর্মভিত্তিক ঘৃণাকে জয় করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলাম, সেই বাংলাদেশ কেন আবার ধর্মান্ধতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে?
পরিশেষে বলতে চাই, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, আমেরিকা, ভারত, ফ্রান্সসহ অনেক দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে ধর্ম বা বর্ণভিত্তিক ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। এই ধর্মভিত্তিক ঘৃণা ও বিদ্বেষের বিস্তার যখন বাংলাদেশে দেখি, তখন মনটা আঁতকে ওঠে। কেননা, বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এই ভূখণ্ডে একটি অসাম্প্রদায়িক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য- যেখানে মানবাধিকার, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা এবং উদার মানবিক বোধে উজ্জীবিত হবে প্রত্যেক বাঙালি। আমাদের কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শই আমাদের পায়ের নিচে যে মাটি আছে, সেই মাটিতে দাঁড়ানোর পাথর-দৃঢ় ভিত্তি।
শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন :অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়