ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ধোলাইরখাল, বাসাবো, দনিয়া, পাটেরবাগসহ ১২টি খালের দুরবস্থা নিয়ে শুক্রবার সমকালের এক প্রতিবেদনে যা লেখা হয়েছে তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। প্রতিবেদন অনুসারে, মাত্র তিন মাস আগে খালগুলোর ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করা হয়; কিছু ক্ষেত্রে খালগুলোর পুনর্খননও হয়। কিন্তু বর্তমানে সেগুলো আবার ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ফলে, চলমান বর্ষা মৌসুমে সামনের দিনগুলোতে একটুখানি বেশি বৃষ্টি হলেই নগরবাসীকে আবারও জলাবদ্ধতাজনিত দুর্ভোগে পড়তে হতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু বর্ষা নয়, বছরের যে কোনো সময় একটু অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টি হলে ঢাকা শহরের বিশেষ করে রাস্তাগুলোর অবস্থা কী দাঁড়ায় তা সবার জানা আছে। ওই সময়টাতে নগরীর কোনো কোনো রাস্তা রীতিমতো নদী বা খালে রূপ নেয়। বিশেষ করে রিকশা, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও অন্যান্য হালকা যানবাহনে চলাচল অনেকাংশে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বহু রাস্তার ধারের দোকানপাট এবং অনেক বাড়ির নিচতলায়ও পানি ঢুকে যায়। এক কথায়, জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। গত কয়েক দশক ধরে এমন দুর্ভোগে পড়তে হয় বলে বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নগরীর পানি নিস্কাশন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার দাবি করে আসছিলেন। সেই দাবিতে সাড়া দিতে গিয়ে সরকার দেখল যে আরও কিছু কারণের পাশাপাশি একদিকে অপ্রতুল পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা এবং আরেক দিকে ভূ-উপরিস্থ পানি নিস্কাশনে অকার্যকর ব্যবস্থার কারণে নগরীতে জলাবদ্ধতা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। শুধু তা নয়, ভূ-উপরিস্থ পানি নিস্কাশনে নগরীর যে খালগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা, সেগুলো প্রধানত ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে দখল ও দূষণের কবলে পড়ে মৃতপ্রায় হয়ে রয়েছে।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সরকার ঢাকার খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থেকে ঢাকা ওয়াসাকে অব্যাহতি দিয়ে তা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বা ডিএসসিসি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বা ডিএনসিসির ওপর অর্পণ করে। দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রও দায়িত্বটি বেশ সানন্দে নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। প্রবাদবাক্যটির সত্যতা প্রমাণে অন্তত ডিএসসিসি ওই দায়িত্বটি ভালোভাবে পালন করতে পারেনি। তারা খালগুলো সংস্কার করলেও এর প্রভাব ধরে রাখার জন্য কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলাকার গৃহস্থালি বর্জ্যের বেশিরভাগ খালগুলোতে পড়ায় এরা আবারও মরণ দশায় পড়েছে। ডিএসসিসি যদি খালগুলোতে ময়লা ফেলার বিপদ সম্পর্কে সেখানকার বাসিন্দাদের সচেতন করত এবং কেউ ময়লা ফেললেও নিয়মিত তা পরিস্কার করার ব্যবস্থা রাখত, তাহলে খালগুলো নিঃসন্দেহে সচল থাকত। অবশ্য, ডিএসসিসি ওই এলাকাবাসীকে যত্রতত্র বর্জ্য না ফেলার গুরুত্ব বোঝাবে কি, এর কর্মকর্তারাই তো এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন বলে মনে হচ্ছে না। যদি তেমনটা না হতো, তাহলে ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারতেন না যে, 'খালের ওপরে বর্জ্যের আস্তরণ, নিচে পানির স্তর আছে। বৃষ্টি হলে সমস্যা হবে না।' এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথাও বলা যায়, ডিএসসিসি যদি তার এলাকায় প্রতিদিন যত বর্জ্য সৃষ্টি হয় এর পুরোটা কার্যকর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পারত, তাহলে ওই এলাকাগুলোর বাসিন্দারা বর্জ্যগুলো পার্শ্ববর্তী খালে নিক্ষেপ করতেন না।
বলা হয়ে থাকে, ঢাকা হলো বিশ্বের সেই অল্প ক'টি শহরের মধ্যে একটি, যা প্রাকৃতিকভাবেই নদী দ্বারা বেষ্টিত। শুধু তা নয়, নগরীতে একসময় বহু খাল জালের মতো বিস্তৃত ছিল, যেগুলোর কোনো কোনোটা ওই নদীগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করত। মোদ্দা কথা, খালগুলো শুধু নগরীর পানি নিস্কাশনই করত না, আন্তঃজেলা বাণিজ্যিক যোগাযোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। আমাদের বক্তব্য হলো, এ খালগুলোর যেগুলো এখনও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব তা অবিলম্বে করতে হবে এবং পুনরুদ্ধারকৃত ও বিদ্যমান খালগুলো সংস্কারের পাশাপাশি সেগুলো যাতে নগরীর পানি নিস্কাশনে সারাবছর কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য আমরা সচেতন নগরবাসীকেও ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানাই।

বিষয় : যে যায় লঙ্কায়

মন্তব্য করুন