২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনা ছাউনিতে হামলার অজুহাত দেখিয়ে রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা নিধন শুরু করে সে দেশের সেনাবাহিনী। মিয়ানমার সেনাবাহিনী নির্বিচারে নারী ধর্ষণ, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও আগুনে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিলে অনেক রোহিঙ্গা প্রাণ হারায়। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়। সরকার হয়তো ভেবেছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরত যাবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতাগোষ্ঠী বাংলাদেশ সরকারের এই মানবিকতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে। কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের সামান্য অগ্রগতি হয়েছিল। যেহেতু ২০১৮ সালে দুই প্রতিবেশী দেশের গৃহীত উদ্যোগের আওতায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একজনকেও ফেরত পাঠানো যায়নি, তাই বাংলাদেশ সরকার বারবার জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এ বিষয়ে সহায়তা চেয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার বিশ্বাস করে, রোহিঙ্গাদের নিরাত্তা, মর্যাদাপূর্ণ, স্বেচ্ছায় এবং মিয়ানমারের রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। কারণ, রাখাইনে তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এবং সে রাজ্য তাদের আদি নিবাস। যদিও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতা থেকে ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নিরাপদে পালিয়ে এসেছে। এ ছাড়া ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিক থেকে সাড়ে ৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে। ভাসানচরে তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। অধিকন্তু, ১ লাখ ২০ হাজার শিশু জন্ম নেওয়ায় রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আরও বেড়েছে। অবিলম্বে তাদের প্রত্যাবাসনের আগে সুরক্ষার দায়িত্বে বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কার্যকর ও মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিল করার জন্য সচেতনতা বাড়াতে এবং নিজেদের দাবির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে রোহিঙ্গারা সম্প্রতি কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে 'গো হোম' ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ ছিল ২০১৯ সালের পর সবচেয়ে বড়। এর কারণ, বিক্ষোভটি ১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার জবাবদিহি এবং নিরাপদে বাড়ি ফেরার দাবিতে পরিণত হয়েছিল।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টার ব্যর্থতার জন্য মূলত মিয়ানমার সরকারই দায়ী। কারণ, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনকে উৎসাহিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরিতে মিয়ানমার সরকার অনীহা প্রকাশ করে।

মিয়ানমার সরকার রাখাইনে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ ব্যর্থ করে দেয়। মিয়ানমার সরকারের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে একজন রোহিঙ্গাকেও রাখাইনে ফেরত পাঠানো যায়নি। কারণ, তারা তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের আশ্বাস ছাড়া ফিরবে না। বাংলাদেশ প্রায় ৮ লাখ ৭৬ হাজার রোহিঙ্গার নাম প্রত্যাবাসনের জন্য নিবন্ধন করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫ হাজার রোহিঙ্গার পরিচয় মিয়ানমার সরকার নিশ্চিত করেছে। অবশিষ্টদের মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বাসিন্দা বলে দাবি করেন।

জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে চাপ দেওয়ার জন্য জোরালো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বকে অবশ্যই রোহিঙ্গা নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করতে হবে। কারণ, তারা গত তিন বছরে মিয়ানমারে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের মতো রোহিঙ্গারাও বিশ্বাস করে, প্রত্যাবাসনই তাদের যন্ত্রণা থেকে অবসানের একমাত্র উপায়।

১৯৭০ এবং '৯০-এর দশকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পূর্ববর্তী অনুপ্রবেশ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নিয়েছিল। কারণ, তখন মিয়ানমারের ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছিল। যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের আইজেসির রায়ের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সেখানে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।

মো. আজম সারওয়ার চৌধুরী: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক