চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা আবার আলোচনায় এসেছে সেখানে জন্ম নেওয়া চারটি সাদা বাঘশাবকের সূত্রে। ২০১৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা দুটি বাঘের নাম দেওয়া হয়েছিল 'রাজ' ও 'পরী'। তাদের ঘরেই ৩০ জুলাই এসেছে চারটি শাবক। এগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে নদীর নামে- পদ্মা, মেঘনা, সাঙ্গু ও হালদা। যে কোনো চিড়িয়াখানায় প্রাণীর নির্বিঘ্ন প্রজনন সেখানকার স্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রমাণ দেয়। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় পরিবেশ যে উন্নত হয়েছে- চার সাদা বাঘশাবক তার প্রমাণ। কিন্তু পরিবেশ উন্নয়ন এক দিনে হয়নি; বিষয়টি সহজও ছিল না।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার যাত্রা শুরু ১৯৮৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। বন্যপ্রাণী বিষয়ক শিক্ষা, গবেষণা এবং বিনোদনের জন্য চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান ফয়'স লেকের পাশেই প্রায় ৬ একর জায়গায় স্থানীয় গণ্যমান্যদের পৃষ্ঠপোষকতায় চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকালে এর প্রবেশমূল্য ছিল ১ টাকা। পর্যায়ক্রমে সর্বশেষ ২০১৯ সালে ৫০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এই টিকিট বিক্রীত অর্থ চিড়িয়াখানার আয়ের একমাত্র উৎস।

চিড়িয়াখানাটি পরিচালনায় নির্বাহী কমিটির সভাপতি থাকেন জেলা প্রশাসক। তাঁকে সহায়তার জন্য সহসভাপতি হিসেবে একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং সদস্য সচিব হিসেবে জেলা প্রশাসক মনোনীত একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করে থাকেন। জেলা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তাই এই দায়িত্বের জন্য চিড়িয়াখানা থেকে সম্মানী গ্রহণ করেন না। 

দুই.

২০১৪ সালের ৮ জুন আমি চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দীন এই দায়িত্ব দিয়ে বলেছিলেন- 'তুমি একটু দেখো তো, চিড়িয়াখানার এই বেহাল দশা কেন?' দায়িত্ব নিয়ে দেখলাম, চিড়িয়াখানার অ্যাকাউন্টে রয়েছে সামান্য টাকা। এত কম কেন? হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা জানালেন, একসঙ্গে কয়েক মাসের বেতন দেওয়া হয়েছে। মাসের বেতন মাসে দেওয়া প্রায়ই সম্ভব হয় না। প্রতি মাসে প্রাণিখাদ্য, স্টাফদের বেতন এবং অন্যান্য ব্যয় বাবদ মোট খরচ ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা। অথচ ব্যালান্স মাত্র পৌনে দুই লাখ! চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখি, পুরো এলাকা দুর্গন্ধে ভরা, জরাজীর্ণ আর বিবর্ণ। প্রথম যে খাঁচার সামনে দাঁড়ালাম, সেখানে কয়েকটি তিতির মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একজন জানালেন, এটা আসলে বাঘের খাঁচা। ২০১২ সাল থেকে বাঘ না থাকায় তিতির রাখা হয়েছে। সিংহের খাঁচার সামনে গিয়ে জানা গেল, ২০০৬ সাল থেকেই এক জোড়া সিংহী পুরুষ সঙ্গীর অভাবে নিঃসঙ্গ অবস্থায় আছে। কুমির দুটো থেকে বেড়ে ১৯টা হলেও খাঁচার আয়তন বাড়েনি। একটা খাঁচার বাইরে কয়েকটা হনুমান ও বানর লাফালাফি করছে। এরা খাঁচার বাইরে কেন? খাঁচা বেশিরভাগই ভাঙাচোরা। ইচ্ছে হলেই এরা বের হয়ে যায়। আবার সন্ধ্যায় নিজ গরজে খাঁচায় ঢুকে পড়ে।

পুরো চিড়িয়াখানায় ইট বিছানো বেহাল রাস্তা। জানতে পারলাম, সিংহসহ কিছু প্রাণীর খাদ্যের জন্য আস্ত গরু কিনে জবাই করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ফ্রিজও কয়েক মাস ধরে নষ্ট। এই সময়ে সিংহসহ অন্যান্য প্রাণী কী খেয়েছে? উত্তর- মুরগি। কাউন্টারে গিয়ে জানা গেল, টিকিট ছাপানো ও বিক্রির কোনো হিসাব নেই। প্রাণী-চিকিৎসক থাকলেও হাসপাতাল নেই। কোয়ারেন্টাইন রুম নেই; দর্শনার্থী শৌচাগারের অবস্থা শোচনীয়। 

তিন.

২০২১ সালের ৯ আগস্ট অব্যাহতি নেওয়ার আগে সাত বছরেরও বেশি দায়িত্বকালীন সঙ্গী ছিলেন পরিশ্রমী ডেপুটি কিউরেটর ডা. শাহাদাত হসেন শুভ। সপ্তাহের ছুটির দিনেও প্রায় নিয়মিত এক বেলা অফিস করেছি চিড়িয়াখানায়। প্রয়োজনীয় ফান্ডের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। বর্তমান চিত্রটা এমন- বাঘের খাঁচায় এখন ১৩টি বাঘই ঘুরে বেড়াচ্ছে; তিতির পেয়েছে আলাদা ঘর; নিঃসঙ্গ সিংহী পেয়েছে সঙ্গী সিংহ; প্রাচীরবেষ্টিত চিড়িয়াখানার ভেতরে নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা নেই; ময়লার স্তূপের জায়গায় এখন দৃষ্টিনন্দন বসার স্থান; নির্মিত হয়েছে মসৃণ সড়ক; নিচে নামার নয়নাভিরাম সিঁড়ি; পরিচ্ছন্ন শৌচাগার; বাড়ানো হয়েছে পশুপাখির সংখ্যা। চিড়িয়াখানায় লাগানো হয়েছে সহস্রাধিক বৃক্ষ; অফিস ভবনের আধুনিকায়ন হয়েছে; রয়েছে প্রাণিখাদ্য সংরক্ষণে আলাদা স্টোর রুম, কোয়ারেন্টাইন রুম; অপারেশন থিয়েটারসহ আধুনিক প্রাণী হাসপাতাল। মাসের ২৮ তারিখের মধ্যেই বেতন পেয়ে যাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা; সঙ্গে বৈশাখী ভাতা ও শীতের পোশাক। গত সাত বছরে ৬ কোটি ৪৯ লাখ ৩১ হাজার ১৭১ টাকার উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ সাধিত হয়েছে টিকিট বিক্রির আয় থেকেই। কোনো অনুদান কিংবা সাহায্য নয়। শুধু একটা গেট নির্মাণ করে দিয়েছিল এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

চার.

কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শুদ্ধাচারের চর্চা থাকলে সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তন হবেই। শুদ্ধাচার চর্চা কেমন পারে এবং এর ধরন কেমন- চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিজ বিবেকের প্রতি দায়বদ্ধতা, অর্পিত দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা; কাজকে চাকরি নয়, দায়িত্ব মনে করে পালন করলে সেখানে সফলতা আসবেই। সর্বত্র শুদ্ধাচারের চর্চা হোক।

মোহাম্মাদ রুহুল আমীন: সাবেক সদস্য সচিব, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা নির্বাহী কমিটি