বছর ঘুরে আবার এসেছে শোকাবহ ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বর্বরোচিতভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর বহমানকে। জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত দিনটিতে দেশবাসীর সঙ্গে সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে আমরাও শোকাহত চিত্তে স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধুসহ পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে শাহাদাতবরণকারী সবাইকে। বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে স্বপ্নের একটি দেশ উপহার দিয়েছিলেন। হাজার বছরের পরাধীন একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়; বিশ্বের বুকে একটা মর্যাদাবান জাতি হিসেবে বাঙালি যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, তার আয়োজনও শুরু করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যে-জাতির মুক্তির জন্য তিনি তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময়ে ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছিলেন; সে-জাতিরই কিছু কুলাঙ্গার সদস্য শুধু বঙ্গবন্ধুকে খুনই করেনি; তাঁকে নির্বংশও করার চেষ্টা চালায়। আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধু হত্যা সাধারণ কোনো খুনের ঘটনা ছিল না। এর পেছনের দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য; বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হলেও, এ হত্যাকাণ্ডের প্রায় অর্ধশতক পরও সে ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়নি।

আমরা দেখেছি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যারা রাষ্ট্রনায়কদের হত্যা করেছে; সেখানে হত্যাকারীদের বিচারের সঙ্গে সঙ্গে ষড়যন্ত্রকারীরাও বিচারের আওতায় এসেছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যার বিচার হয়েছে; আবার তাঁর হত্যার ষড়যন্ত্র উন্মোচনের জন্য গঠন করা হয়েছে ওয়ারেন কমিশন। ভারতেও মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডের বিচার যেমন হয়েছে; পাশাপাশি হত্যার ষড়যন্ত্র উন্মোচনের জন্য আলাদা কমিশন গঠন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার ৪৭ বছর পর হলেও কমিশন গঠনের মাধ্যমে এ কাজ সহজ হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে কতটা ষড়যন্ত্র হয়েছিল; ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী খন্দকার মোশতাক ওই দিনই রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। সে সময়ের প্রশাসন যেভাবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সব ধরনের দায় থেকে মুক্তি দিতে বেআইনিভাবে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে; বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয় এবং পরবর্তী সামরিক শাসকরা যেভাবে এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে; তাতে ষড়যন্ত্রকারীদের পরিচয় অনেকাংশেই পরিস্কার হয়ে যায়। তবে ইতিবাচক দিক হলো, বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্য কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচনের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত ষড়যন্ত্রকারীদের খোঁজার বিষয়ে একটি কমিশনের রূপরেখা প্রস্তুত হয়েছে এবং এই বছরের শেষ নাগাদ কমিশনের কাজ শুরু হবে। আমরা মন্ত্রীর কথায় আশ্বস্ত হতে চাই। কমিশন বঙ্গবন্ধু হত্যায় ষড়যন্ত্রের একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুলে ধরবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ষড়যন্ত্র ও হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্যও এটা জরুরি। আমাদের জানামতে, ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের দায়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যেসব আসামি এখনও বিদেশে পালিয়ে আছে; তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে ওই রায় কার্যকরের চেষ্টাও অব্যাহত আছে। আমরা সরকারের এ কাজে দ্রুত সাফল্য প্রত্যাশা করি। ১৫ আগস্ট এ জাতির কপালে যে কলঙ্করেখা আঁকা হয়েছিল; অন্তত তা মোচনের জন্যও এ রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ শাসন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। অথচ এক শতাব্দী আগে বাংলার প্রত্যন্ত পল্লিতে জন্মগ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু যেভাবে উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, তা বিশ্বেরও বিস্ময়। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামমুখর জীবন এবং অল্প সময়ের শাসনকালে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার যে পরিচয় আমরা পাই, সেটিও কম বিস্ময়কর নয়। আমরা বিশ্বাস করি, মাঝপথে খুনিরা যদি তাঁকে থামিয়ে না দিত তাহলে বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়ই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়ে যেত। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তাঁরা বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে অবিচল থাকবেন; তাঁর আদর্শ লালন করে এখানে প্রকৃত অর্থেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করবেন।