নাটোরের আলোচিত কলেজ শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ইতোমধ্যে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। খায়রুনের স্বামীকে ৫৪ ধারায় আটক করেছে পুলিশ। সবই ঘটেছে চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময়ে।

এবার একটু পেছনে যাই। ফেসবুকে পরিচয়ের পর ছয় মাস প্রেম, তারপর বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন নাটোরের কলেজছাত্র মামুন হোসেন (২২) ও শিক্ষিকা খায়রুন নাহার (৪০)। তাঁরা নাটোর শহরের একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতেন।
গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর এম হক ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহারের প্রথমে বিয়ে হয়েছিল রাজশাহীর বাঘা উপজেলায়। পারিবারিক কলহে বেশি দিন টেকেনি সে সংসার। সেখানে তাঁর এক সন্তান রয়েছে। তারপর কেটে যায় অনেক দিন। এর মাঝে পরিচয় হয় কলেজছাত্র মামুনের সঙ্গে। তিনি নাটোরের এনএস সরকারি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তাঁরা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং সবশেষে বিয়ে করেন। তাঁরা সামাজিক কারণে বিয়ের খবর গোপন রেখেছিলেন।
ছয় মাস পর ফেসবুকে দু'জনের ছবিসহ বিয়ের খবর 'আনুষ্ঠানিকভাবে' প্রকাশ করলে মুহূর্তেই তা সামাজিক মাধ্যমে 'ভাইরাল' হয়ে যায়। শুরু হয় সংবাদকর্মীদেরও দৌড়ঝাঁপ। পরিস্থিতি সামলাতে নাটোরের ভাড়া বাসা ছেড়ে অন্যত্র কয়েকদিন কাটিয়েছিলেন এই দম্পতি। ওই সময় স্বামীর বক্তব্য- 'মন্তব্য কখনও গন্তব্য ঠেকাতে পারে না' তুমুল আলোচিত হয়। স্ত্রীকে পাশে রেখে আত্মবিশ্বাসী মামুন বলেছিলেন- 'কে কী বলল সেগুলো মাথায় না নিয়ে নিজেদের মতো সংসার গুছিয়ে জীবন শুরু করেছি।' একই সময়ে খায়রুন নাহার বলেন, 'প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত মানসিক কষ্টে কাটত। একবার আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ঠিক সেই সময় ফেসবুকে পরিচয় হয় মামুনের সঙ্গে। মামুন আমার খারাপ সময় পাশে থেকে উৎসাহ দিয়েছে এবং নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছে। সে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে আমাকে। আর সেই ভালোবাসা থেকেই দু'জনের সিদ্ধান্তে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই।'
আমরা বিস্মৃতপ্রবণ। তবুও এতটা বিস্মৃতি আমাদের নিশ্চয়ই পেয়ে বসেনি যে, মাত্র মাসখানেকের একটি ঘটনা আমরা ভুলে যাব। খায়রুন এবং মামুনের বিয়ে বিষয়ক নিউজগুলো অনলাইনে এবং ডিজিটালমাধ্যমে যেখানে প্রকাশ হয়েছিল, সেসবের নিচে মন্তব্যগুলোর কথা আমরা মনে করতে পারি। শিক্ষিকা এবং ছাত্র কীভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো তা নিয়ে কদর্যপূর্ণ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে খুবই আপত্তিকর মন্তব্যতে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল সামাজিক মাধ্যম। সে তুলনায় তাদের স্বাগত জানানো মন্তব্যের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। বিশেষত ওই শিক্ষিকা 'গুরুজন' হয়েও একজন ছাত্রের সঙ্গে কী করে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন তা নিয়ে মন্তব্য কম দেখা যায়নি।
কেউ কি একবার ভেবে দেখেছেন, শিক্ষক হয়ে ছাত্রীকে বিয়ে করার অজস্র উদাহরণও আমাদের চারপাশে আছে? এই যে, শিক্ষক হয়ে ছাত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক করা যাবে আর বিপরীতে শিক্ষিকা হয়ে ছাত্রের সঙ্গে করা যাবে না- এই সিদ্ধান্ত কে চাপিয়ে দিয়েছে? এটা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আরও একটা 'বেটাগিরি' নিশ্চয়।
এখন খায়রুনের মৃত্যুর পর কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন, সামাজিক-পারিবারিক নানা তিরস্কারের মুখে খায়রুন স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিয়েছেন। খায়রুনের ময়নাতদন্তকারী দলের সদস্য নাটোর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার বক্তব্য থেকেও ধরা যায়, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, খায়রুন নাহার আত্মহত্যা করেছেন। রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য মৃতদেহ থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
খায়রুন স্বেচ্ছামৃত্যু নাকি হত্যার শিকার- তা প্রমাণ সাপেক্ষ এবং আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। কিন্তু এটা নিশ্চিত- বৈধভাবে, সামাজিকভাবে বিয়ে করার পরও খায়রুন-মামুন দম্পতি সামাজিক ঝড়ের শিকার হয়েছিলেন। ফেসবুক এবং সংবাদমাধ্যমে তাদের নিয়ে প্রচারিত বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন ত‎াঁরা। পারিবারিক চাপ তো ছিলই।
এখন, খায়রুন নাহারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমাদের জনপরিসরের যে নোংরা দিকটি উন্মোচিত হলো- তা কি আমরা ভেবে দেখব না? খায়রুন যেভাবে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, তার স্বপ্নকে কারা ভেঙে দিল? এই দায় আমরা এড়াব কী করে?

এহ্‌সান মাহমুদ: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক