আবারও পুরান ঢাকায় আগুনে পুড়ে অঙ্গার হলেন ছয়জন। সোমবার দুপুরে সেখানকার কামালবাগ-দেবীঘাট এলাকার একটি চারতলা ভবনে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ভবনটির নিচতলার 'বরিশাল হোটেল'-এর গ্যাস লিকেজ থেকে প্রথমে আগুন লাগে। এর পর তা মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবন শুধু নয়, আশপাশেও ছড়িয়ে পড়ে।

হতভাগ্য ছয়জন ছিলেন ওই হোটেলের শ্রমিক। তাঁরা সারারাত ডিউটি করে সকালে রেস্টুরেন্টের ভেতরেই বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলেন। এত দ্রুত আগুন ছড়ানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক ওই ভবনজুড়ে থাকা অতিদাহ্য প্লাস্টিকের গুদামকে দায়ী করেছেন। আগুন নেভাতে গিয়ে তিনি সেখানকার কোনো ভবনে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা দেখেননি বরং অধিকাংশ ভবনে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্লাস্টিকের অনেক কারখানা দেখেছেন।

মনে আছে, গত বছরের এপ্রিলে আরমানিটোলায় কেমিক্যালের দোকানের আগুনে পাঁচজনের মৃত্যুর পর ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ থেকে একই কাহিনি আমরা শুনেছিলাম। ২০১৯ সালে চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুনে ৭১ জনের মৃত্যুর পর একই ধরনের দুঃখজনক চিত্র উঠে এসেছিল। ২০১০ সালে ওই এলাকার নিমতলীতে যখন ভয়াবহ আগুনে ১২৪ জন প্রাণ হারান, তখনও এসব বিষয়ে অনেক কথা হয়েছিল।

এ বিষয়গুলো স্মরণ করার কারণ এটা দেখানো, এক যুগের ব্যবধানেও পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অথচ প্রতিটি ঘটনার পর ব্যাপক জনঅসন্তোষ দেখে সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে তো সোজাসুজি বলা হলো, খুব অল্প সময়ের মধ্যে পুরান ঢাকার সব কেমিক্যাল-প্লাস্টিক কারখানা ও গুদাম রাজধানীর বাইরে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে।

আমরা সংবাদমাধ্যমে কয়েকবার দেখেছি, এ জন্য প্রথমে কেরানীগঞ্জ, পরে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে জায়গা ঠিক করা হয়েছে। এর মধ্যে যখন চুড়িহাট্টার ঘটনা ঘটল, তখন কর্তাব্যক্তিরা বললেন, ওই প্লাস্টিক পার্ক চালু করাই তাঁদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বাস্তবে ওই প্রতিশ্রুতি এখনও অনেকাংশে কাগুজেই রয়ে গেছে। চুড়িহাট্টার আগুনের পর তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র বলেছিলেন, ওই এলাকা থেকে শুধু কেমিক্যাল কারখানা বা গুদাম নয়, সব অবৈধ প্লাস্টিক কারখানা উচ্ছেদ করা হবে। তাঁর ওই প্রতিশ্রুতির পর চকবাজার এলাকার কিছু অনুমোদনহীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ বিচ্ছিন্নও করা হলো। কিন্তু তা যে খুব একটা এগোয়নি, সোমবারের আগুনই তার প্রমাণ।

এটা ঠিক, বিভিন্ন নানা কারণে পুরান ঢাকায় আবাসিক ভবনে নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সেখানকার কেমিক্যাল ও প্লাস্টিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এর ব্যতিক্রম নয়। অর্থাৎ রাতারাতি এ আবাসিক এলাকা থেকে এসব প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া শুধু সময় বা ব্যয়সাপেক্ষই নয়; সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণেও বেশ দুরূহ। কিন্তু এর মানে এই নয়; মানুষকে বছরের পর বছর এ বারুদের স্তূপের ওপর বসবাস করতে দেওয়া হবে। একসময় ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঘটেছে বলে এখনও তা চলতে দেওয়ার অন্তত যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ নেই।

আমরা মনে করি, ব্যবসার করার জন্য যে ন্যূনতম ট্রেড লাইসেন্স, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবা দানকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে; সে ব্যাপারে কড়াকড়ি করা হলে পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে নানা ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের কারবারিরা একটা নিয়মের মধ্যে আসতেন; এখন যার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। এত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ পুরান ঢাকার ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ যে নিল না, তাও এক রহস্য।

আমরা জানি, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নিজ দায়িত্বের প্রতি অব্যাহত উদাসীনতাই এ অবস্থার কারণ। তবে ঔপনিবেশিক লিগাসি হিসেবে মানুষের জীবনের প্রতি তাদের এক ধরনের অবজ্ঞাসুলভ মানসিকতাও এ জন্য দায়ী হতে পারে। যাই হোক, আমাদের প্রত্যাশা, ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি সরকার যথাযথ তদন্তপূর্বক অবিলম্বে বরিশাল হোটেল ট্র্যাজেডির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

বিষয় : সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন