শনিবার মস্কোতে গাড়ি বিস্ম্ফোরণে ডারিয়া দাগিনা নামে যিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তিনি কট্টর ডানপন্থি (বৈশ্বিক বিশ্নেষকরা কট্টর ডানপন্থি বলতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো কিংবা পশ্চিমাদের বুঝিয়ে থাকেন) ফরাসি ভাষার মিডিয়া ব্রেইজ ইনফো ওয়েবসাইটের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নিজের পরিচয় এভাবে দিয়েছিলেন- 'আমি ইউরেশিয়ানিস্ট আন্দোলনের (রাশিয়ানকে বিস্তৃতভাবে বলা যায় ইউরেশিয়ান) একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ।... ফলে আমি রাশিয়ান, পাকিস্তানি, তুর্কি, চীনা ও ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে হাজির হই। সভ্যতার দ্বন্দ্বের স্বরূপ বোঝার জন্য উৎকৃষ্ট উদাহরণ ইউক্রেন। একে বিশ্ববাদের সঙ্গে ইউরেশিয়ান সভ্যতার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা যেতে পারে।'

গাড়িবোমায় ২৯ বছর বয়সী দার্শনিক ও সংবাদিক ডারিয়া দাগিনা যেভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তার পেছনের কারণ খুব সম্ভবত তাঁর বাবা আলেকজান্ডার দাগিন। হত্যাকারীরা হয়তো তাঁর বাবাকেই টার্গেট করেছিল। আলেকজান্ডার দাগিন একজন দার্শনিক, যাঁকে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে বলা হতো "পুতিনস' ব্রেইন" বা পুতিনের মস্তিস্ক। অনেকে বলছেন, তিনি পুতিনের তাত্ত্বিক গুরু। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের ওপর তাঁর প্রভাবের বিষয়টিও সবার জানা। আলেকজান্ডার দাগিন ও তাঁর মেয়ে ডারিয়া দাগিনা উভয়ে একত্রে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের সমর্থনে আয়োজিত একটি প্রোগামে যাচ্ছিলেন। সেখানে দাগিন বক্তব্যও রেখেছিলেন। অনুষ্ঠান থেকে তাঁদের উভয়ের একসঙ্গে বাসায় ফেরার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে আলেকজান্ডার আলাদা গাড়িতে যান বলেই বেঁচে যান। এ সময় ডারিয়া দাগিনা বাবার গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছিলেন এবং পথেই গাড়িটি বোমায় বিস্ম্ফোরিত হয়। তবে তাঁরা কাছাকাছিই ছিলেন।

ডারিয়া দাগিনা এক সময় বলেছিলেন, 'আমি এবং আমার বাবা একই নৌকার আরোহী তথা একই ধারা ও বিশ্বাসের মানুষের হওয়ার বিষয়টি আমার কাছে সম্মানের। একজন বিদগ্ধ জ্ঞানী ও লেখকের কন্যা হওয়া সৌভাগ্যের বিষয়। তিনি ২৪ খণ্ডের বই নুমাচিয়ার (মনের যুদ্ধ) রচয়িতা। বাস্তবতা হলো, আমাদের দাগিনদের বিরুদ্ধে যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তার মানে আমরা বিশ্ববাদের বিরুদ্ধে সঠিক পথে আছি।'

বলা বাহুল্য, তাঁরা যে সত্যের পথে রয়েছেন, সেটি ছিল নিও-প্ল্যাটোনিজম বা নতুন প্ল্যাটোবাদ। এ নিয়ে অবশ্য আমি কথা বলতে চাই না।

অর্থডক্স চার্চের কাছে অনেকাংশেই এ মতবাদ এখনও ফ্যাশনের মতো। এর সঙ্গে রাশিয়ার অধুনা উগ্র জাতীয়তাবাদের মিল পাওয়া যায়। কিন্তু ডারিয়া নিও-প্ল্যাটোনোভা (লেখক হিসেবে দাগিনার ছদ্মনাম) এটা বলার জন্য হত্যার শিকার হননি- 'আধুনিক প্ল্যাটোনিস্টে রাজনৈতিক দর্শনের মূল চিন্তার বিষয় হলো, মন ও দৃশ্যবাদের সমঅবস্থানের উন্নয়ন।' তাঁর বাবা এই ভয়ানক মতবাদের জন্য হত্যার টার্গেটে পরিণত হননি।

ডারিয়া দাগিনার সঙ্গে আমার কখনও সাক্ষাৎ হয়নি। তবে প্রায় ১২ বছর আগে একবার আমি তাঁর বাবার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম।

সে সময়ও ভদ্মাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেই দেখা হতো (এখন নিশ্চয় আলেকজান্ডার দাগিন পুতিনের ঘনিষ্ঠ নন। এমনকি তিনি মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষকতার চাকরিও হারিয়েছেন)।

সেই সময় পর্যন্ত আমার রাশিয়ান ভাষার দখল খুব ভালো ছিল না। তাই তাঁর সুন্দর গোছানো ফ্ল্যাটে সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য আমি একজন দোভাষী নিই। আলেকজান্ডার দাগিন সে সময় বলছিলেন, কীভাবে দুষ্ট বিদেশিদের দ্বারা রাশিয়ার মানুষ প্ররোচিত হয়। সে জন্য তিনি তাদের বিপরীতে 'এক্সিসটেনশিয়াল পলিটিকস'-এর কথা বলেন। বলা বাহুল্য, তাঁর বক্তব্যের মধ্যে বিমূর্ত নামের বাইরেও কিছু মৌলিক নীতির বিষয় ছিল। আমি তখন বিষয়টি বুঝতে পারছিলাম এবং দোভাষীকে জানালাম, তিনি যা বলছেন তার অনেক কিছুই তিনি বাদ দিয়ে আমার কাছে বর্ণনা করছিলেন। আমি ভাবলাম, তিনি তাঁর নিজের জন্যই তাড়াতাড়ি বলে যাচ্ছেন কিনা। কিন্তু ওই সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর যখন তাঁকে বিষয়টি বলি তখন তিনি আমাকে জানালেন, আলেকজান্ডার দাগিন এমন কিছু বিষয় বলেছিলেন, যা আমাকে জানাতে দোভাষী বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। তিনি রাগত ও অধৈর্য হয়ে ব্যাপক কথা বলছিলেন। কিন্তু জাতীয়তাবাদ নিয়ে যে কথা বলছিলেন তা ছিল নির্মম এবং অভূতপূর্ব।

তবে মূল বিষয় হলো, রাশিয়ার নীতিতে তাঁদের প্রভাব কতটা ছিল, সেদিক বিবেচনায় আলেকজান্ডার দাগিন কিংবা তাঁর মেয়েকে টার্গেট করা হবে- এমনটি বলা যায় না। ডারিয়া দাগিনা ইউক্রেনে হামলার একজন কট্টর সমর্থক ছিলেন। এমনকি তিনি রাশিয়ার বিজয় লাভ করা মারিওপোলো শহরও সফর করেছেন। কিন্তু তিনি আর দশজন উৎসাহদাতার মতোই ছিলেন। ইউক্রেনের পূর্বদিকে রুশ অধ্যুষিত অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের মাঝে মারিওপোলোর অবস্থান, যার দক্ষিণে ক্রিমিয়া। শহরটি কৌশলগতভাবে রাশিয়ার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতেই ইউক্রেনের অন্যতম বৃহত্তম এ শহর মারিওপোলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেয় রাশিয়া। শহরটি রুশ সেনাদের দখলে রয়েছে। সেখানে দাগিন অন্য অনেকের মতোই গিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে কে তাঁর গাড়িতে বোমা পুঁতে রাখল? এটি ইউক্রেনীয় কেউ ঘটিয়েছে, যারা ইউক্রেনের গোয়েন্দা হিসেবে রাশিয়ায় কাজ করে; নাকি রাশিয়ায় থাকা গুপ্ত কেউ, যাদের ইউক্রেনীয়রা অর্থ দেয় (রাশিয়াতে প্রায় ২০ লাখ ইউক্রেনীয় বাস করে)?

আলেকজান্ডার কিংবা ডারিয়া কি ন্যায়সংগত 'টার্গেট' ছিলেন? বাবা কিংবা মেয়ে কেউই যুদ্ধের দর্শক হিসেবে একেবারে নিষ্পাপ ছিলেন না নিশ্চয়। কিন্তু তাঁরা ছিলেন অস্ত্রহীন সাধারণ, বেসামরিক নাগরিক। তাই তাঁদের ওপর বোমা ফেলা অবশ্যই অপরাধ।

প্রশ্ন হলো, এটা কি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড? অবশ্যই দাগিনাকে হত্যার এ কাজ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। আমরা যদি বিশেষ পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখি, যুদ্ধের এ অবস্থায় ইউক্রেন রাশিয়ার যে কোনো জায়গায় দায়মুক্তি নিয়েই হামলা করতে পারে। রাশিয়া যাতে ইউক্রেনে তাদের আগ্রাসন বন্ধ করে সে জন্য রুশদের আতঙ্কিত করতে ইউক্রেনীয়রা হামলা করতে পারে। এমন কোনো প্রভাব ওই ঘটনা সৃষ্টি করবে, সেটা বলা যাবে না। তবে এর উদ্দেশ্য এমনটি হওয়াই বিশ্বাসযোগ্য। তাহলে কি এটি অন্যত্র ইউক্রেনীয় পক্ষের জনমতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না? একটু হলেও করবে। কারণ একজন তরুণীকে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া মোটেই ভালো কাজ নয়। তবে তা খুব বেশি সময় থাকবে না। কারণ, এটি যুদ্ধের সময়। আমরা দেখেছি, একই দিনে রাশিয়ার গোলাগুলিতে ইউক্রেনের ভসনিসেনস্কে ১২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। যার মধ্যে চারটি শিশু। তাহলে পার্থক্যটা কী? রাশিয়ার বন্দুকধারীরা তাদের শিকারদের নাম জানত না। আর ইউক্রেনীয়রা যে বোমা পুঁতেছে, তাতে ডারিয়া দাগিনা নিহত হয়েছেন- এ তথ্য ছাড়াও আরেকটা পার্থক্য হলো, দাগিনার খুনিদের পরনে কোনো ইউনিফর্ম ছিল না।

জিনি ডায়ার: যুক্তরাজ্যভিত্তিক কানাডীয় সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদির বিশ্নেষক; নিউজিল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম স্টাফ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক