কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা এবং জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী গোলাম নবী আজাদের দল থেকে পদত্যাগে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি যে সময়ে পদত্যাগ করেছেন, সেটি উল্লেখযোগ্য। কারণ ২০১৪ সাল থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রায় ঘুমন্ত কংগ্রেসে 'ভারত জড়ো যাত্রা' কর্মসূচির মাধ্যমে দলটির জেগে ওঠার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। আজাদ নিশ্চিত হয়েছিলেন, তাঁর এই পদত্যাগ সাময়িকভাবে গোপন রাখা হবে। কারণ বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাব ও সাম্প্রদায়িক আচরণের বিরুদ্ধে কংগ্রেস দেশব্যাপী জাগরণের ডাক দিয়েছে। গোলাম নবী আজাদ তাঁর পদত্যাগপত্রে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, তাঁর পদত্যাগের মতো পরিস্থিতির জন্য দায়ী সাবেক কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। কংগ্রেসের বিদ্রোহী গোষ্ঠী 'জি-২৩' এর সব থেকে বড় নেতা ছিলেন গোলাম নবী আজাদ।
আমার মনে হয়, এই পদত্যাগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এর কারণ উদ্ঘাটন করা দরকার। ভারত যেখানে এগিয়ে যাচ্ছে কংগ্রেস সেখানে পিছিয়ে যাচ্ছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, এই কংগ্রেসই আধুনিক ভারত নির্মাণ করেছে। জরুরি অবস্থার মতো কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছাড়া গণতান্ত্রিক অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক উদারীকরণের সংস্কার ও বেসরকারীকরণ, হাইটেক ও টেলিযোগাযোগের বৈপ্লবিক বিস্তারেও কংগ্রেসের অবদান উল্লেখযোগ্য। এর পরও কেন দলটিতে হতাশা? কারণ আর কিছুই নয়, দলটির নেতৃত্ব। করপোরেট বিশ্বে একটি প্রবাদ- একটি কোম্পানি তার নেতার মতো হয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং গোলাম নবী আজাদ যে রাহুল গান্ধীকে স্পষ্ট 'টার্গেট' বানিয়েছেন, তা অস্বাভাবিক নয়।
২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে কংগ্রেসের প্রভাব ব্যাপকভাবে কমতে থাকে। তখন দলটির একজন প্রেরণাদায়ক নেতার প্রয়োজন ছিল, যিনি তার নেতাকর্মীদের উৎসাহ দেবেন; সব পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কাজ করবেন এবং খোলামেলা মতপ্রকাশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করবেন। এটাই একটি দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র। এর বিপরীতে রাহুল গান্ধী যা করেছেন, তা ছিল অপ্রত্যাশিত। তিনি তখন বাস্তব অর্থেই অদৃশ্য হয়ে যান। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও একটি বিস্তারিত পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন নিয়ে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিলাম। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম, প্রশান্ত কিশোর বুদ্ধিজীবিতার দিক থেকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁর দ্বার রক্ষকরা এতটাই অনড় ছিল যে, আমি দেখা করতে ব্যর্থ হই। যা হোক, এবার আমরা কেবল গোলাম নবী আজাদের পত্যাদগই দেখছি না; একই পথে হেঁটেছেন আনন্দ শর্মা, এমনকি জয়বীর শেরগিল।
কংগ্রেসের এক নেতা একবার আমাকে এক অদ্ভুত তত্ত্বের কথা বলেছেন- কংগ্রেসকে অবশ্যই টিভি অনুষ্ঠান দেখা বাদ দিতে হবে। তাঁর পরামর্শের সত্যতা অবশ্য দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর। তখন কংগ্রেস হেরে যাওয়ায় দলটি দীর্ঘ সময়ের জন্য টিভি চ্যানেল বয়কট করেছিল। তখন আমি এই সিদ্ধান্তের কঠোর বিরোধিতা করে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, মূলধারার সংবাদমাধ্যম হলো মানুষের কাছে পৌঁছার বাহনের মতো। বিরোধী দলের জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যম ত্যাগ করা মানে আমাদের সামষ্টিক আত্মহত্যা। রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ একজন বিরক্ত হয়ে আমাকে বলছিলেন, 'এ আলোচনা বন্ধ করুন নতুবা এর ফল ভালো হবে না।' গোলাম নবী আজাদ এবং আনন্দ শর্মার ক্ষেত্রে হয়তো এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। রাহুল গান্ধীর অনেক বংশীবাদক যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করছে, তারা অনতিক্রম্য লবি হয়ে উঠেছে। কারণ রাহুল গান্ধী কাজের চেয়ে কথা বলা বেশি পছন্দ করেন। যোগাযোগের এই ধারা স্পষ্টতই
বুমেরাং হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসে এখনও মেধাবী ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক, নীতিনির্ধারণে সক্ষম, রাজনৈতিক ভিত-সমৃদ্ধ ভোটার আকর্ষণের ক্ষমতাবান নেতা রয়েছেন। কংগ্রেস জেগে উঠলে এখনও বিজেপিকে হতাশ করতে পারে এবং আগামী বছরের নির্বাচনে দুই দলের ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে গুজরাট, হিমাচল, কর্ণাটক, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা কিংবা ছত্তিশগড়ে। কিন্তু কংগ্রেসকে প্রথাগত দর্শন থেকে বেরিয়ে এসে আরও সাহসী ও বাস্তববাদী হতে হবে। একগুঁয়ে না হয়ে রাহুলকে সংগ্রাম করতে হবে। কংগ্রেসের দরকার প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-শচীন পাইলট নেতৃত্ব।
আমরা দেখছি, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মধ্যে এক সহজাত কারিশমা রয়েছে। তিনি সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করেন। বড় যুদ্ধ তিনিই সম্পন্ন করতে পারবেন। তিনি গান্ধীভক্তদের দলের ভেতরে ও বাইরে সন্তুষ্ট করতে পারবেন, যা আর কারও দ্বারা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তিনি কষ্টসাধ্য পরিশ্রমী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী, যিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা পছন্দ করেন। এটা সম্ভব। কিন্তু কংগ্রেস কি নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করবে, নাকি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, এটা তাদের বিষয়। তবে তাদের স্মরণ করা দরকার যে, তারা খুব বড় দল বলে টিকে থাকবে- এমনটি ভাবার কারণ নেই। লেমেন ব্রাদার্স কোম্পানির দিকে তাকানো যায়? কীভাবে এত বড় কোম্পানিটি শেষ হয়ে গেল! কিংবা ফ্রান্সের সোশ্যালিস্ট এবং লা রিপাবলিকানস নামক এক সময়ের বড় দল দুটিও এখন কার্যত নেই বললেই চলে।
কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কেবল গোলাম নবী আজাদ নন, বরং পুরো ভারতই পর্যবেক্ষণ করবে।
সঞ্জয় ঝা: কংগ্রেসের সাবেক মুখপাত্র; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক