বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এ উপলক্ষে এখন দেশের বিভিন্ন এলাকার দুর্গা মন্দিরে চলছে প্রতিমা বানানোর কাজ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে গত কয়েক বছরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, দুর্গাপূজা এলেই বিভিন্ন মন্দিরে, বিশেষ করে রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তদের হাতে চলে প্রতিমা ভাঙার খেলা। এ বছরও সনাতন ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার এ জঘন্য ধারা বজায় থাকলে আমরা বিস্মিত হবো না। ইতোমধ্যে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় এ ধরনের এক ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে বলে খবর এসেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, গত বৃহস্পতিবার রাতে সেখানকার এক দুর্গা মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, শুক্রবার দুপুরে পুলিশ ও প্রশাসনের উপস্থিতিতেই প্রতিমাগুলোর ভাঙা অংশ মেরামত করা হলেও ভাঙচুরকারীরা এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। একই দুর্ভাগ্যজনক চিত্র আগের ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূর্তি ভাঙচুরকারীরা ধরা পড়লেও বলা হয়েছে, তারা 'মানসিক রোগী'। ফলে এ পর্যন্ত সংঘটিত প্রতিমা ভাঙচুরের সব ঘটনায় বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে। যদিও দেশের আইনে সুস্পষ্টভাবে এসব অপরাধের জন্য শাস্তি নির্দিষ্ট করা আছে। নিঃসন্দেহে এ পরিস্থিতি প্রতিমা ভাঙচুরকারীদের অপকর্ম চালাতে উৎসাহিত করেছে।
এদিকে গত বছর দুর্গাপূজায় ঘটেছে আরও ভয়ংকর কিছু ঘটনা। পূজা চলাকালে কুমিল্লার এক পূজামণ্ডপে মূর্তির পায়ের ওপর কোরআন শরিফ রেখে আশপাশের সাধারণ মুসলিমদের সেখানে হামলা চালাতে প্ররোচিত করা হয়। একদিকে কোরআন অবমাননার এ ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করা হয়; আরেকদিকে অনেক সময় পর্যন্ত প্রশাসন নিষ্ফ্ক্রিয় থাকে। ফলে মুহূর্তের মধ্যে এ ঘটনা গোটা কুমিল্লা শহর শুধু নয়; চাঁদপুর, নোয়াখালীতেও ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি পরবর্তী সময়ে এর রেশ ধরে রংপুরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে হিন্দুসমাজের সদস্যদের ওপর হামলা চলে। তাদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। একটা সম্প্রদায়ের ওপর স্রেফ ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে এহেন বর্বর হামলা দেখে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমা হলে প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে। কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, বছর ঘুরে আরেকটা দুর্গাপূজা চলে এলেও ওই হামলাগুলোর একটারও বিচার শেষ হয়নি। শুধু কি তাই? গত ৫০ বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও অন্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর যত হামলা হয়েছে; সেগুলোরও কোনোটাতেই ভুক্তভোগীরা প্রতিকার পাননি। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগে আওয়ামী লীগ আরও কিছু প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সংখ্যালঘু সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, সে প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
আমরা অস্বীকার করছি না, বর্তমান সরকারের সময়ে দেশে পূজামণ্ডপের সংখ্যা হয়েছে বহু গুণ। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া স্লোগান 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার' মেনে সব সম্প্রদায়ের মানুষ এ উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে, গত ১০ বছরে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এসবের কোনো প্রতিকার না পেয়ে নির্যাতিতরা ক্রমান্বয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে। তাদের এ হতাশা একদিকে শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক সংহতির প্রতি হুমকি তৈরি করবে, আরেকদিকে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর। ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদের প্রতি মোহ যদি কিছু থাকে, তা ঝেড়ে ফেলে সরকার মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে, তা নিশ্চিতে আন্তরিক হবে। এরই প্রকাশ হিসেবে বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের প্রত্যাশা, সরকার আগের মতো এবারও সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব পালনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও উৎসাহ দেবে। সর্বোপরি, গতকাল সোমবার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, রোববার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাতটি মানবাধিকার সংগঠন জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমন্বয় করে পূজার নিরাপত্তা বিধানে সরকারের প্রতি যে দাবি জানিয়েছে; এর প্রতিও সমর্থন জানাই।

বিষয় : সম্পাদকীয় উৎসব ও উৎকণ্ঠা

মন্তব্য করুন