২২ আগস্ট সমকালে 'আস্থা নেই, রোগী ছুটছে বিদেশ' শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। শুধু চিকিৎসকের প্রতি আস্থাহীনতা, তাদের অদক্ষতা কিংবা রোগ নির্ণয়ে সময়ক্ষেপণ যদি এই প্রবণতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করি, তাহলে বিষয়টির গভীরতা অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অলৌকিক চিকিৎসা কিংবা জাদুকরী ব্যবস্থা দিয়ে রাতারাতি এর সমাধান বের করে ফেলতে পারবে না। দেশের মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা দূরীকরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করণীয় নির্ধারণের অনভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি রোগীবান্ধব হওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি, চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থার সর্বস্তরে সর্বগ্রাসী রাজনীতিকীকরণ, সুবিধাবাদী গোষ্ঠীচিন্তা, রোগীর সংখ্যা আর প্রয়োজনের তুলনায় দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, সব বিশেষায়িত বিষয়ে অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে।
আমাদের কর্মপরিমণ্ডলে বিদ্যমান রোগ ও রোগের চিকিৎসায় যথাযথ লাগসই ব্যবস্থাপনা নির্ধারণে প্রয়োজনীয় গবেষণার ক্ষেত্রে অনীহা ও অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিদ্যমান একাধিক ডিগ্রির সমন্বয় সাধনে ব্যর্থতা রয়েছে। বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের একটি বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক প্রবণতা, নীতি ও নৈতিক অবক্ষয় যা চিকিৎসক এবং সেবাগ্রহীতা উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। সঠিক রোগ নির্ণয়ে অত্যাধুনিক ও মানসম্পন্ন বিপুলসংখ্যক ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক সুবিধার অপ্রতুলতা এর কারণ। শুধু দক্ষ চিকিৎসক নয়; একটি দক্ষ হাসপাতাল বিশেষজ্ঞ দলও তৈরি করা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত আর প্রশিক্ষিত হওয়ার সুযোগের সীমাবদ্ধতাও দায়ী। এসব বিষয় বাদ রেখে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া দুরূহ। দেশের সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে বিদেশের করপোরেট হাসপাতালের সেবার মান তুলনা করা ঠিক হবে না। শুধু বাজেট বৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ করে চিকিৎসাপ্রার্থীদের বিদেশ গমনের প্রবণতা কমানো যাবে না। আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ল্যাপারোস্কপি সার্জারির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু দেশে সরকারিভাবে এ বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা সনদ প্রদানের ব্যবস্থা নেই। তাঁরা প্রশিক্ষিত হয়েছেন নিজ দায়িত্বে। দেশের মেডিকেল ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনেক স্নাতকোত্তর কোর্স রয়েছে, যা চলছে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ছাড়াই। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় রয়েছেন সর্বোচ্চ সংখ্যক বিশেষজ্ঞ; যাঁদের রয়েছে কমপক্ষে চার ধরনের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি; আর তাঁরাই বেশি পদোন্নতিবঞ্চিত। দেশের কোনো হাসপাতালে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের ব্যবস্থা নেই। দেশে দুই-তিনটি হাসপাতাল ছাড়া কোথাও নিয়মিত কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হয় না। দেশে রোবটিক সার্জারি হওয়া দূরে থাক; অধিকাংশ চিকিৎসক রোবট দেখেননি। দেশের কোনো হাসপাতালে জেনেটিক বা বায়োমলিকুলার ল্যাব নেই। সাধারণের বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট হয় একটিমাত্র জায়গায়। দেশে হাতেগোনা হাসপাতালে রয়েছে আইসিইউ সুবিধা। জেলা হাসপাতাল দূরে থাক, সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও নেই হার্টে রিং পরানোর ব্যবস্থা। কিডনি ডায়ালাইসিসের কোনো সুবিধা নেই জেলা হাসপাতালে। করোনাকালে হাজার হাজার ভেন্টিলেটর কেনা হয়েছে। স্থাপিত হয়েছে অক্সিজেন প্লান্ট। সেগুলোর কী অবস্থা এখন; ক'জন মানুষ সেবা পেয়েছে ওগুলো দিয়ে? কতজন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ তৈরি করেছি আমরা করোনাকালে?
সাবেক অধ্যক্ষ :শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া
avelbogra@gmail.com

বিষয় : মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল

মন্তব্য করুন