উপমহাদেশের ফুটবল ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ইংরেজদের নিয়ে আসা এই খেলা প্রথম থেকেই স্থানীয় ক্লাবগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা আর তরুণদের পরিচর্যায় বিকশিত হয়েছে। ক্লাবগুলো তারুণ্যের স্বাভাবিক প্রাণশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং নতুনত্বের প্রতি আকর্ষণকে কাজে লাগিয়েছে। ফুটবলকে সাধারণ মহলে পরিচিত, গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করার পেছনে ক্লাবের অবদান স্মরণীয়। শুধু আমাদের উপমহাদেশ নয়; যখন যে দেশে ফুটবল পৌঁছেছে, সেখানেই খেলাটিকে দেখভাল করেছে সেসব দেশের ক্লাব। ক্লাব থেকেই নতুন নতুন প্রতিভার বিকাশ ঘটেছে। বস্তুত ফুটবলের সব গল্প ও কাহিনির শুরু তো ক্লাব থেকেই। মানোন্নয়ন, খেলোয়াড় সৃষ্টি, মাঠের ফুটবলে পরিবর্তন, আকর্ষণ বৃদ্ধি, উন্মাদনা- সবকিছুর 'মেরুদণ্ড' হলো ক্লাব ফুটবল। ক্লাব ফুটবলের রূপের প্রতিফলনই তো হয় জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক ফুটবলের পারফরম্যান্সে।

বিশ্বজুড়ে এখন ২১০টি দেশে ফুটবল খেলা হয়। সব দেশের ক্লাবের অন্যতম দায়িত্ব হলো- 'ডেভেলপিং নেশন ফুটবল'। কোনো দেশের জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশনের এই দায়িত্ব নয়। ফেডারেশনের দায়িত্ব হলো নৈতিকতা এবং সুশাসনের মাধ্যমে দেশ এবং দেশের বাইরে ফুটবলের কার্যক্রম- ফুটবল লিগ, টুর্নামেন্টের আয়োজন, বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং পরিচালনা। এএফসি এবং ফিফার সঙ্গে পেশাদারিত্বের মোড়কে কার্য পরিচালনা এবং দেশে ফুটবলের প্রয়োজনীয় কাঠামো নিশ্চিত করা, যাতে ফুটবল কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়।

বাংলাদেশে ক্লাবগুলো সবচেয়ে বেশি উৎসাহী 'রেডিমেড' খেলোয়াড় বিষয়ে। কিন্তু খেলোয়াড় তো জন্ম হয় না; তৈরি করতে হয়। আর খেলোয়াড় তৈরির নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। দেশের ফুটবলে এ ক্ষেত্রে গলদ রয়েছে। এ জন্যই মাঠের ফুটবল ধুঁকছে; সংকটের মধ্যে খাবি খাচ্ছে। উত্তরণে চিন্তা ও চেষ্টা নেই বলে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। দেশের ফুটবলে বড় দুর্বলতা হলো এই চত্বরের সব মানুষের মধ্যে ঐক্যহীনতা। ফুটবল-সংশ্নিষ্টদের মধ্যে বিভাজনের বিরূপ প্রভাব এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিফলিত হচ্ছে। ফুটবলে ধারাবাহিকতার সঙ্গে উন্নতির কথা না ভেবে ক্লাবগুলো ভাবছে সাময়িক সাফল্য নিয়ে।

এটা ঠিক, গত কয়েক বছর ধরে ফুটবল মাঠে আছে। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। প্রিমিয়ার লিগের খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে। তবে জাতীয় দল এখনও মেঘের আড়ালে। কারণ ক্লাবগুলো ফুটবল নিয়ে যদি না ভাবে, তাহলে জাতীয় দল কখনও ভালো করতে পারবে না। বিএফএফ নতুন খেলোয়াড় সৃষ্টি এবং খেলার মানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে পুরুষ ও নারী খেলোয়াড়দের একাডেমি চালাচ্ছে। এটি তাদের কাজ নয়। তবুও করেছে দেশের ফুটবলের স্বার্থে। সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করে চাইছে জেলায় জেলায় ফুটবলে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে। এই লড়াইয়ে বিএফএফ কিন্তু এখনও জিততে পারেনি। ফুটবল ফেডারেশনের আওতাধীন ডিএফএফের যেভাবে জেলার ফুটবল নিয়ে কাজ করা উচিত, ৫০ শতাংশ ডিএফএফ এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ।

ক্লাবগুলোকে যুবদল রাখতে হবে- এটি ফিফার নির্দেশ। এর পরও ক্লাবগুলো চাচ্ছে না এ খাতে বিনিয়োগ করতে। তারা যদি বিনিয়োগ করে তাহলে ভবিষ্যতে অনেক বেশি রিটার্ন পাবে। ক্লাবের অধীনে নির্দিষ্ট অনুশীলন থাকার কারণে যুব খেলোয়াড়দের (পুরুষ ও নারী) গুণগত মান বাড়বে। এদের পক্ষে সম্ভব হবে সঠিকভাবে ফুটবল রপ্ত করা। ক্লাবগুলোকে দলবদলের সময় অনেক বেশি টাকা দিয়ে খেলোয়াড় কিনতে হবে না। এমনকি ভালো দামে অন্য ক্লাবের কাছে খেলোয়াড় বিক্রি করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফুটবলে তরুণদের সঠিকভাবে কাজে লাগানোর এটাই সময়। কয়েক বছর পর এই সুযোগ আর ব্যাপকভাবে থাকবে না। ফুটবলে পরিবর্তন এবং সংস্কার সাধনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে হবে ক্লাবগুলোকে। জেলা পর্যায়েও যুবদল নিয়ে মাথা ঘামানো হচ্ছে না বলে আমাদের স্থানীয় খেলোয়াড়দের চেয়ে ভারতের স্থানীয় খেলোয়াড়রা অনেক এগিয়ে।

দেশের ফুটবলে তরুণ খেলোয়াড়দের একসঙ্গে ধরে রেখে প্রশিক্ষণ দিয়ে বেশ কয়েকজন নতুন খেলোয়াড় সৃষ্টি করেছে প্রিমিয়ার ফুটবলের দল সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব। ক্লাবটি সম্প্রতি দেশের ফুটবল থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বিএফএফকে জানিয়েছে। এটি দেশের ফুটবলের জন্য একটি ধাক্কা। নতুন খেলোয়াড় সৃষ্টিতে এদের একটি সুন্দর প্রক্রিয়া ছিল।

কিছুদিন আগে বাফুফের ডেভেলপমেন্ট কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাফুফে এলিট একাডেমি নামে একটি দলকে আগামী প্রিমিয়ার লিগে খেলানোর। সর্বশেষ বাংলাদেশ পেশাদার লিগের দ্বিতীয় স্তরে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে প্রথমবারের মতো খেলতে নেমে চতুর্থ হয়েছে বাফুফে এলিট একাডেমি। বাফুফের নির্বাহী কমিটিতে এটি অনুমোদিত হলে দেশের ফুটবলে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে এ উদ্যোগ।

চলতি বছরের প্রথমদিকে এক দিন কথা হচ্ছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি ও বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি মো. ইমরুল হাসানের সঙ্গে দেশের ফুটবল নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, বসুন্ধরা স্পোর্টস কমপ্লেক্সে আরেকটি অনুশীলন মাঠ তৈরি ও একাডেমি ভবনের কাজ শেষে বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ শুরু করা হবে। এই ছেলেমেয়েরা গড়ে উঠলে বাইরে থেকে আর খেলোয়াড় কিনতে হবে না। কিংসে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খেলোয়াড়দের অন্য ক্লাবগুলোও অর্থের বিনিময়ে কিনতে পারবে। এতে দেশের সার্বিক ফুটবল উপকৃত হবে।

বস্তুত বয়সভিত্তিক ফুটবলে জোর দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তারুণ্যতে পৃষ্ঠপোষকতা করতেই হবে। দীর্ঘ সময়ের পর অনূর্ধ্ব-১৮ যুব ফুটবল আবার মাঠে নামতে যাচ্ছে। ক্লাবগুলোর তো যুবদল নেই। তাই তারা বিভিন্ন একাডেমি এবং জেলা থেকে রেডিমেড খেলোয়াড় এনে ক্লাবের নামে মাঠে নামাবে। এএফসি এবং ফিফা জানবে, যুব ফুটবল আবার হচ্ছে। এটি এক ধরনের বিভ্রান্তি। নিজেদের দল নেই, তাই ভাড়াটে খেলোয়াড় দিয়ে দল গঠন করে লাভ কী!

পেশাদার লিগে ক্লাবগুলোর জন্য পুরুষ ও মহিলা যুবদল রাখতেই হবে। আসন্ন অনূর্ধ্ব-১৮ যুব ফুটবলে যদি ক্লাবগুলো বয়স্ক খেলোয়াড় মাঠে নামায়, তাহলে টুর্নামেন্টের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

ইকরামউজ্জমান: ক্রীড়া লেখক ও বিশ্নেষক