বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে বিভিন্ন মহলে কৌতূহল রয়েছে। উভয় দেশেই এটা নিয়ে চলছে আলোচনা। কেউ কেউ সোজা কথায় জানতে চাইছেন- এই সফরে বাংলাদেশ কী পাবে? আমার মনে হয়, এই সফর আসলে গত এক-দেড় দশকে নতুন মাত্রা পাওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই আরও সুসংহত করবে। দুই পক্ষের সদিচ্ছার ভিত্তিতে এই সময়ে যতটুকু অভিন্ন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে; সেখান থেকে কোন পক্ষ কতটুকু সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তা খতিয়ে দেখা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে 'সেপা' চুক্তি তথা কম্প্রিহেন্সিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা আলোচনায় আছে। এর মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছু যে তৈরি হবে- এটা আশা করা যায় না। বিদ্যমান যে ব্যবসা-বাণিজ্য উভয় দেশের মধ্যে চালু রয়েছে, তারই একটি বিধিবদ্ধ সংস্করণ পাওয়া যেতে পারে হয়তো। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপরেই এটি দাঁড়াবে।

আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিরাট ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়টি। বাংলাদেশে যে পরিমাণ ভারতীয় পণ্য আমদানি হয়, সে তুলনায় ভারতে আমাদের পণ্য যায় খুবই কম। সেপা চুক্তিতে শুধু বাণিজ্য নয়, বিনিয়োগের ওপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। আমরা যদি সেখানে পণ্য রপ্তানি বাড়াতে পারি, তাহলে নিশ্চয় বাংলাদেশ লাভবান হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, দুই দেশের মধ্যে 'কর্মসংস্থান ঘাটতি' রয়েছে। বাংলাদেশে এখন কয়েক লাখ ভারতীয় নাগরিক বিভিন্ন পেশায় কর্মরত। ভারতেও বাংলাদেশি নাগরিকদের একই সুযোগ থাকা উচিত।

শুধু অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এমন আরও কিছু বিষয় রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আলোচনা হতে পারে। যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাংলাদেশ-ভারতের যে যোগাযোগ ব্যবস্থা, তা এখনও সড়ক এবং রেলপথেই সীমিত। নৌ চলাচল নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে; স্বীকার করতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি নিয়ে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। আমি মনে করি, নৌ চলাচলে যদি অগ্রগতি আনা যেত, তাহলে দুই পক্ষই লাভবান হতো। বাংলাদেশের দিক থেকে আমরা বেশি লাভবান হতে পারতাম।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনিবার্যভাবেই আসবে পানিসম্পদের কথা। দুই দেশের মধ্যকার অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে একটি সুরাহা অবিলম্বে হওয়া দরকার। তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুটি এতদিন যেভাবে ঝুলে আছে, তা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অসন্তোষের কারণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে বারবার প্রতিশ্রুতির পরও বিষয়টির সমাধান হয়নি। এটি ঝুলে থাকার কারণ কারিগরি যুক্তি দিয়ে বোঝানো যেত পারে; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে মনোপীড়ার কারণ হয়ে থাকবে এটা- চুক্তিটি চূড়ান্ত হলেও স্বাক্ষরিত হয়নি শুধু সামান্য অজুহাতে। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে বারবার প্রতিশ্রুতির পরও যখন চুক্তিটি স্বাক্ষর হয় না, তখন এটি হতাশায় পর্যবসিত হয়।

অভিন্ন নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু কতটা উপেক্ষিত হয়েছে, তা দেখা গেছে দীর্ঘ ১২ বছর পর গত মাসে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের মধ্য দিয়ে। এটা ঠিক, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর সামনে রেখে কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন বিষয়ে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে আরও যে নদীগুলো রয়েছে, তার পানি বণ্টন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় রয়েছে- পানি বণ্টন, পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা। ফলে বিষয়টি সহজ নয়। কিন্তু চুক্তি করতে গিয়েই যদি দেরি করতে থাকি, তাহলে বিষয়গুলো আরও জটিল হতে থাকবে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-ফাইল ফটো


রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতকে আরও সক্রিয় অবস্থায় দেখতে চাই আমরা। কারণ ভারত সক্রিয় না হলে এটি যেমন বাংলাদেশের জন্য সমস্যাজনক, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। কারণ এটা যদি হুমকিতে পড়ে, তবে আমাদের যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে, তাও অধরা থেকে যাবে। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ডের সঙ্গে যে সড়ক যোগাযোগের কথা বলা হচ্ছে, তা যদি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা থেকেই যায়, তাহলে কী করে সম্ভব হবে! আবার ভারতেরও মিয়ানমারের সঙ্গে প্রকল্প রয়েছে। চীনা বেল্ট তৈরির একটি পরিকল্পনাও আছে। এখানে যদি রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে যায়, তবে অর্থনৈতিক যে পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে, তা পরিকল্পনাতেই রয়ে যাবে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে জ্বালানিও একটি বড় খাত হয়ে উঠেছে। আমরা ইতোমধ্যে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছি। এখন শোনা যাচ্ছে, ডিজেলও আমদানি করা হবে পাইপলাইনের মাধ্যমে। ভূ-রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পাশাপাশি এটাও বিবেচনা করতে হবে, নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন করে আমদানি করতেও বাংলাদেশ আগ্রহী। সে বিদ্যুৎটি অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও পরিবেশসম্মত হবে। তাতে যে শুধু বাংলাদেশ লাভবান হবে, তা নয়; ভারতও লাভবান হবে। কারণ তাদের গ্রিড হয়ে বিদ্যুৎ আসবে। নেপাল-ভুটানের জনগণও লাভবান হবে। কাজেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে নেপাল-ভুটানকে যুক্ত করে।

আরও বড় পরিপ্রেক্ষিতে যদি বিষয়টি দেখি; বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতানুগতিক চেহারা বদলানো শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। তখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি উন্মুক্ত আঞ্চলিক নীতির কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ উন্মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার কথা বলা হয়েছিল। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে এটিকে ধরা যায়। প্রধানমন্ত্রীর একটি 'ক্রিয়েটিভ আইডিয়া' হিসেবে এটি দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। এই ধারণার অংশ হিসেবে ভারত, নেপাল ও ভুটানকে বাংলাদেশের বন্দরগুলো ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। এ ধারণার বাস্তবায়ন সম্ভব হলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে যুক্ত করে উন্মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর করা যেত। শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়; মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মধ্যে যে আঞ্চলিক সড়ক কাঠামো রয়েছে, তার সঙ্গেও বাংলাদেশ যুক্ত হতে চায়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেমন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে, তেমনই বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোও সে সুবিধা পাবে।

বস্তুত প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফর গত এক যুগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাত্রা এবং তার ভিত্তিতে সামনের দিনের পরিকল্পনা করতে সহায়ক হতে পারে। আমাদের দেশে অনেকেরই ধারণা রয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দিয়েছে বেশি; নিয়েছে কম। এখন এ ধারণা পরিবর্তন করতে হলে ভারত ছাড়াও প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ বাংলাদেশকে দিতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যেমন প্রত্যাশা, তেমন আশঙ্কাও রয়েছে। একই চিত্র সীমান্তের ওপাশে ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যেও রয়েছে বৈকি। কিন্তু বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ ও ভবিষ্যৎমুখী করার বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে গেলে এবং আলোচনার মধ্য দিয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন কঠিন হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফর সামনে রেখে সে প্রত্যাশাই করি।

এম হুমায়ুন কবীর: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত