ইডেন কলেজের ক্ষমতাধর নেত্রীদের নিয়ে সংবাদমাধ্যমে একের পর এক খবর বেরোচ্ছে। সেখানে ছাত্রলীগ নেত্রীদের এতই দাপট, তাঁরা যখন তখন সাধারণ ছাত্রীদের ওপর চড়াও হন। গালাগাল তো আছেই; শারীরিকভাবে নির্যাতন করেও তাঁরা দিব্যি পার পেয়ে যান। সর্বশেষ বুধবারের সমকালে আমরা দেখেছি, এক ছাত্রীর শরীরে গরম চা ঢেলেছেন এক নেত্রী। ওই নেত্রী ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সহসভাপতি। সোমবার অঘটনটি ঘটেছে কলেজটির শহীদ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছাত্রীনিবাসে।
ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের কোনো ছাত্রী নন যে, কলেজে নতুন এসেছেন বলে আদব-কায়দা শেখাতে গিয়ে তাঁর গায়ে নেত্রীর চা পড়েছে বা আদর করে একটুখানি হাত মচকে দিয়েছেন। তিনি মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। হলের পাঠকক্ষে প্রবেশের পথে ওই নেত্রীর অনুসারী এক শিক্ষার্থী টেবিল বসিয়ে পড়ছিলেন। চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় তাঁকে সরে বসতে বলা হয়। কিন্তু তিনি বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। ফলে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ওই নেত্রীর অনুসারী ভুক্তভোগীকে রীতিমতো হুমকি দিয়ে বলেন- 'আমি দেখে নেব কীভাবে তুমি এই কলেজে পড়ো।' ওই ছাত্রী না দেখলেও অবশ্য 'দেখেছেন' তাঁর নেত্রী। ওই সন্ধ্যার দিকে ১০-১২ জনকে সঙ্গে নিয়ে ভুক্তভোগীর কক্ষে যান। সে সময় ছাত্রী চা পান করছিলেন। সমকালের প্রতিবেদন মতে, নেত্রী তাঁকে গালাগালের এক পর্যায়ে মগে থাকা গরম চা তাঁর পায়ে ঢেলে দেন এবং হাত মচকে দেন।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী হল সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ পেশ করেছেন। হল সুপার কী ব্যবস্থা নেবেন, তা আমরা জানি না। তবে আমরা দেখে আসছি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি কলেজের হলগুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের কাছে প্রাধ্যক্ষ, হল সুপার এমনকি প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা কতটা অসহায়। এর আগে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভার ফাঁস হওয়া বক্তব্যেও তা স্পষ্ট হয়। ২৬ আগস্ট সমকালে প্রকাশিত খবরের শিরোনাম- ইডেনের 'ডন' রিভা। অডিওতে রিভা বলেন, 'আমি যদি একটা সিট না দেই, ২০২ থেকে তোদের কোন বাপ সিট দিবে? ম্যাডামরা দিবে, ক্ষমতা আছে ম্যাডামদের? ম্যাডামদের ক্ষমতা আছে আমাদের রুম থেকে একটা মেয়েকে বের করার? ইডেন কলেজের প্রিন্সিপালেরও ক্ষমতা নেই এই রুম থেকে একটাকে বের করার।' অডিও ফাঁস হওয়ায় তিনি ফেসবুকে ক্ষমা চাওয়ার পরও তাঁর হাতে ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, সোমবার যে নেত্রীর হাতে ছাত্রী নিপীড়িত হয়েছেন, তিনিও ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী। তাঁর ক্ষমতার জোর সেখানেই। আর সে জন্যই উগ্র মেজাজের এ নেত্রী সাধারণ ছাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু নেত্রী নিজেই ক্ষমতাবান নন; বরং তাঁর ক্ষমতার দাপট নিয়ে অন্যদের অবস্থাও দেখার মতো। হলগুলোর পাঠকক্ষ আবাসিক সব শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত। সেখানে সবাই সমান অধিকার নিয়ে পড়াশোনা করবেন। পাঠকক্ষ দ্বন্দ্ব-সংঘাতেরও জায়গা নয়। অথচ সেখানেও সেই দাপট! কেন সেখানে চলাচলের জায়গা দখল করে বসতে হবে? বসলেও আরেকজন অভিযোগ করলে জায়গা ছেড়ে দেওয়াই শোভন। তা না করে সেটাকেই ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা বানানো হলো। সঙ্গে কলেজ থেকে বের করার হুমকি!
এটা যে ইডেন কলেজের বিচ্ছিন্ন ঘটনা- এমনটা বলা যাবে না। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শাসক সমর্থিত ছাত্র রাজনীতি এমনই নিষ্ঠুর। কাক কাকের মাংস না খেলেও এখানের শিক্ষার্থী হয়েও আরেক শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলা যায়। প্রশাসনের নাকের ডগায় অবলীলায় এ ধরনের অপরাধ হলেও বলার কেউ নেই। দল থেকেও ব্যবস্থা নেওয়ার নজির কম। শিক্ষকরাও কিছু বলতে সাহস পান না। কেউ সাহস করলেও বদলি, পানিতে ফেলে দেওয়া কিংবা এ ধরনের কোনো অপমান হজম করতে হয়। এ অবস্থায় নেতা-নেত্রীদের একটু শাসন করার সাধ্য কার? চাচা আপন বাঁচা। আর নিপীড়নের শিকার হয়েও ভুক্তভোগীদেরই হল ছাড়তে হয়। সেটাও এক ধরনের বাঁচা বৈ কি।
মাহফুজুর রহমান মানিক: সাংবাদিক ও গবেষক
mahfuz.manik@gmail.com