মঞ্চজুড়ে হালকা আলো; সাদামাটা কক্ষে পায়চারি করছেন শেখ মুজিব। দীপ্তিময় প্রক্ষেপণ তাঁর অবয়ব ছাড়িয়েছে। তাতে অনাড়ম্বর পাঞ্জাবির গোটানো হাতা সবিশেষ সাদাসিধে; পায়ের চটিজোড়া স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল।

মুজিব হাঁটছেন মেঝের এ-প্রান্ত থেকে সে-প্রান্তে। অতঃপর দাঁড়ালেন মাঝ বরাবর। চুরুটের ধোঁয়ায় হালকা আচ্ছন্ন। সব নৈর্ব্যক্তিকতা ছাপিয়ে হাজারো দর্শকের জোড়াচোখ আরেকবার দেখল এদেশের মানচিত্র কিংবা তাঁর বিশাল বুক। অকস্মাৎ ঘরে ঢুকলেন তাজউদ্দীন।

মুজিব আড়মোড়া ভেঙে বলে উঠলেন- 'তাজউদ্দীন, এতো ফরমালিটি করো ক্যান? তুমি হলে গিয়ে বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। আমার ঘরে যহন কেউ থাকবে না, হানিপকে জিজ্ঞাসা করবা- ভিতোরে ঢুকে পড়বা। আর এটা তো গণভবন না, এটা তো বত্রিশ নম্বর বাড়ি, নাকি!'

-আপনি এখন দেশের প্রেসিডেন্ট। আমি অর্ডিনারি সিটিজেন। পার্থক্যটুকু আমাদের থাকতেই হবে।

-তাজউদ্দীন, আমি তোমার কাছে মুজিব ভাই হয়েই থাকতে চাই।

স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন শেখ মুজিব। দরাজ কণ্ঠের অনুরণন ছড়িয়ে পড়ল অডিটরিয়ামের দেয়ালে দেয়ালে। 

ততক্ষণে অজস্র করতালি। জয় বাংলা ধ্বনিতে আরেকবার কম্পিত হলো লন্ডনের লোগান হল। অতঃপর দু'ঘণ্টা ধরে চলা নাটকের বাঁকে বাঁকে তৈরি হলো ক্লাইমেপ। অন্তঃচাপের নিস্তব্ধতা ভেঙে বাঙালি আবারও জেগে উঠল। কেউ কেউ বললেন, জয় বঙ্গবন্ধু।

বলছিলাম 'পলাশী থেকে ধানমন্ডি' নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন আবহ। 'প্রোটাগনিস্ট ক্যারেকটার' করেছিলেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি একাধারে নাট্যজন, লেখক ও সাংবাদিক। ২৩ সেপ্টেম্বর পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। আজকের দিনে তিনি ছাড়িয়ে গেলেন বয়স ৭২। তাঁর জন্য শতায়ু প্রার্থনা।

'পলাশী থেকে ধানমন্ডি' ডকু-ড্রামার নেপথ্যের কাহিনি জানতে চাইলে নাট্যজন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফরের দল যা করেছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরেও তার সবিশেষ মিল পেয়েছিলেন বোদ্ধা সাংবাদিক গাফ্‌ফার চৌধুরী। কাহিনিটিকে মঞ্চনাটকে রূপ দিতে বেশ ক'জন লিজেন্ড অভিনেতার সঙ্গে কথাও বলেন। কিন্তু কেউ রাজি হননি শেখ মুজিবের চরিত্রে অভিনয় করতে। বহু খোঁজাখুঁজির পর পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পেয়েছিলেন। প্রস্তাব দিলে পীযূষ রাজি হয়ে যান।

অবশ্য এর একটা বিশেষ সুবিধে খুঁজে পেয়েছিলেন নাট্যকার গাফ্‌ফার চৌধুরী। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি ফরিদপুরে। কৈশোরে বেড়ে ওঠা গোপালগঞ্জে। কথাবার্তায় বঙ্গবন্ধুর যে বিশিষ্টতা তার পুরোটাই ছিল পীযূষের মধ্যে। আঞ্চলিকতার মিষ্টি ভাব, ভাষার সারল্যপনা ও অহমবোধ ঠিক রাখতেই ওই এলাকার একজনকে খুঁজছিলেন গাফ্‌ফার চৌধুরী।

শেখ মুজিবের চরিত্রে অভিনয় করবেন-দিনরাত তাই মুজিবের খুঁটিনাটি সংগ্রহ করতেই ব্যস্ত থাকা। দিনের পর দিন নিউমার্কেট খুঁজে উদ্ধার করতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর গোঁফ। কেমন স্যান্ডেল পরতেন, চুল আঁচড়াতেন কীভাবে, পাঞ্জাবির হাতা কেমন করে গোটাতেন আর কেমন করেই বা চুরুট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তেন- সবই রপ্ত করতে হয়েছিল পীযূষকে। 

পূর্ব লন্ডনের একটি বাড়িতে রিহার্সাল হতো। ইউরোপের আরও ক'টি দেশ থেকে কুশীলবেরা এসেছিলেন, যাঁদের কেউ কেউ একেবারে নবীন। অভিনয় সম্পর্কে তেমন ধারণাও ছিল না। চেতনার বশে দু'জন ছুটে এসেছিলেন নিউইয়র্ক থেকে। মানিক ও মাহবুবুলের অবদান এখনও মনে আছে পীযূষের। অর্থাৎ একদিকে জোট সরকারের চলমান বর্বরতা, অপরদিকে সঙ্গোপনে গণনাটকের প্রস্তুতি। শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, বিজন ভট্টাচার্যদের আদলে রাস্তার মোড়, গঞ্জের ভিড় কিংবা অপেরা হাউসের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিল জাতির পিতার আত্মত্যাগ। ইতিহাস বিকৃতির বিপরীতে ইউরোপবাসীকে জানাতে চেয়েছিল নানামুখী ডামাডোলের কারণে 'প্রমিথিউস' মুজিবের নাম কেন ভুলতে বসেছিল বাঙালি। এমনকি শেখ মুজিবকে যাতে ভুলতে বাধ্য হয় তার জন্য প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে।

নাটকটি বাংলাদেশে মঞ্চস্থ করা একেবারেই অসম্ভব ছিল। লন্ডন পুলিশের অনুমতি মিললেও বাঙালি প্রতিপক্ষের ব্যারিকেড ছিল। চেষ্টা হয়েছিল হামলা করে লন্ডভন্ড করার। লন্ডন থেকে বাংলাদেশে নাটকটির স্ট্ক্রিপ্ট এসেছিল যারপরনাই সঙ্গোপনে। বঙ্গবন্ধুর মেয়েদের তত্ত্বাবধান ছাড়া প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হতো- বলেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০০৫ সালের কোনো এক সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে অভিনীত হয়েছিল 'পলাশী থেকে ধানমন্ডি'। হলভর্তি দর্শক। একেকটি ডায়ালগ শেষ হতেই মুহুর্মুহু করতালি আর জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান। মঞ্চে সেদিন আলোর প্রক্ষেপণও ছিল ব্যাকরণ মেনে। সবমিলে শো শেষ হবার পর এক বৃদ্ধা এসেছিলেন গ্রিন রুমে মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে। হাতটা ধরে করুণভাবে বলেছিলেন, শেখ মুজিবকে দেখিনি। তোমাকে দেখে মনটা ভরে গেলো।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে হয়েছিল- অভিনয়জীবনটা সার্থক হলো আজ। একই সময়ে এস্টোরিয়াতে 'পলাশী থেকে ধানমন্ডি'র শো হয়েছিল। সেখানেও হলভর্তি দর্শক ছিল কিন্তু ব্রুকলিনের ঘটনা আজও ভুলতে পারেন না পীযূষ। নিউইয়র্কের মঞ্চায়ন এতটাই গোছানো ছিল যে, অন্য স্টেটের বাঙালিরা একের পর এক আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন। যেমন করে আগের দিনের যাত্রাদলের বায়না হতো।

অতঃপর বিভিন্ন দেশ থেকে ডাক আসে। এতবড় লটবহর নিয়ে দেশে দেশে মঞ্চায়ন করাটা ছিল সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। কর্মজীবীদের একসঙ্গে হওয়াটাও ছিল আরেক চ্যালেঞ্জ। পরে সিদ্ধান্ত হয়, এভাবে মঞ্চায়ন নয়, ভিডিওতে রূপ দিয়ে সিডি পাঠাতে হবে দেশে দেশে। শেষতক তাই হলো। ২০০৬ সালে কলকাতায় শেষ হয় দৃশ্যধারণের কাজ। ইউটিউবের কল্যাণে 'পলাশী থেকে ধানমন্ডি' ডকুড্রামা এখন সবাই দেখতে পান। 

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বঙ্গবন্ধুকে এখন প্রতিদিন দেখে মানুষ। প্রতিক্ষণ তাঁর কণ্ঠ শোনে। কিন্তু ওই সময়টিতে হামলা-মামলা উপেক্ষা করে প্রমিথিউস মুজিবকে জনতার অন্তর্গহীনে দাঁড় করানোটা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং।

এখন কমার্শিয়াল ভেঞ্চার থেকে সিনেমা হচ্ছে জাতির পিতাকে নিয়ে। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশা, এসব কাহিনি সবার মনে দাগ কাটবে। কিন্তু ২০০৪ সালে গাফ্‌ফার চৌধুরীর প্রয়াসটি যেমন ধ্রুপদি, তেমনি সন্ধ্যাদীপের মতো জাজ্বল্যমান।