ওষুধের দোকানে ফার্মাসিস্ট থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। আবার ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়াই চলছে অনেক ফার্মেসি। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রির নিয়ম না থাকলেও বেশিরভাগ দোকানে নির্বিচারে বিক্রি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক, ঘুমের ট্যাবলেট ও যৌন উত্তেজক ওষুধ। বিক্রেতার পরামর্শে ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর ইচ্ছানুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে দিন দিন কার্যকারিতা হারাচ্ছে জীবন রক্ষাকারী এ ওষুধটি।

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ঘুমের ওষুধ বিক্রি এক ধরনের মাদক ব্যবসাই বলা যায়। কারণ তরুণ সমাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের মানুষ ঘুমের ট্যাবলেট ও কাশির সিরাপ নেশার উদ্দেশ্যে সেবন করে। এর পাশাপাশি রয়েছে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট। ওষুধের পাইকারি বাজার মিটফোর্ড থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশি-বিদেশি, খ্যাত-অখ্যাত কোম্পানির ওষুধ। এসব সেবনে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি কারও কারও মৃত্যু হচ্ছে।

ব্যবস্থাপত্রে থাকা ওষুধের বদলে ক্রেতাকে মানহীন কোম্পানির ওষুধ ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে অনেক ফার্মেসির বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সাধারণ রোগী দোকানে রোগের উপসর্গ জানালে নিজের মতো করে ওষুধ দিচ্ছেন বিক্রেতারা। এতে সাময়িক সমাধান হলেও জটিল সমস্যা বাসা বাঁধে রোগীর শরীরে।

দেশে ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত ও ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রি বন্ধে ফার্মেসি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে মডেল ফার্মেসির স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মডেল ও সাধারণ মিলিয়ে দেশে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৮৯টি ফার্মেসি রয়েছে। এগুলোর একটি অংশ নিবন্ধন নেওয়ার পর আর নবায়ন করেনি। এ ছাড়া নিবন্ধন ছাড়া ফার্মেসি রয়েছে দেড় লাখের মতো। শুধু করোনার ২ বছরে দেশে ফার্মেসি বেড়েছে ৪০ হাজার। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্ট নেই। দেশে প্রতিবছর ৩-৪ হাজার গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বের হচ্ছেন। তাঁদের বেশিরভাগ সরাসরি ওষুধ উৎপাদনে যুক্ত হচ্ছেন। বাকিরা দেশ ছাড়ছেন কাজের সুযোগ না পেয়ে এবং বিদেশে লোভনীয় প্রস্তাব পেয়ে।

গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের বলা হয় এ-গ্রেডের ফার্মাসিস্ট। ডিপ্লোমাধারীদের বি-গ্রেড ও ৩-৬ মাসের কোর্স সম্পন্নকারীদের সি-গ্রেডের ফার্মাসিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিটি ফার্মেসিতে এ-গ্রেডের একজন ফার্মাসিস্ট থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশিরভাগ ফার্মেসির মালিক বা স্টাফ ৩-৬ মাসের কোর্স করে নিজের নামেই ফার্মাসিস্টের সনদ নিয়ে নিচ্ছেন। দালাল আর অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে বাগিয়ে নেওয়া হয় ড্রাগ ও ফার্মাসিস্টের সনদ।

মুদির দোকানের চেয়ে সহজ হয়ে গেছে ওষুধের ব্যবসা। ফলে ২-৪ বছর ওষুধের দোকানে বিক্রেতা হিসেবে চাকরি করেই অনেকে ফার্মেসির মালিক হয়ে যাচ্ছেন। কোনো পাবলিক পরীক্ষায় পাসের সনদ থাকা বা না থাকা এসব মালিক কখনও কখনও সি-গ্রেডের ফার্মাসিস্টের সনদ থাকা স্টাফকে চাকরি দিয়ে তাঁর নামে ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু করান। মিটফোর্ডের সহজলভ্য ওষুধ আর ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রি করেই অল্প দিনে বড় ফার্মেসির মালিক হয়ে যান। কিন্তু এরই মধ্যে ঝুঁকিতে পড়ে যায় অনেক জীবন। ফার্মেসির মালিকরা অনেকের কাছে ডাক্তার হিসেবে পরিচিত। এসব 'হাতুড়ে ডাক্তার' ইচ্ছামতো ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে ছোটখাটো অপারেশনও করে। সেই অপারেশনে চূড়ান্ত মূল্য হিসেবে অনেক রোগী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। বিশেষ করে দাঁত তোলার পর মুখে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার খবর মাঝেমধ্যে পাওয়া যায়। ওষুধের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে সব ফার্মেসি ও হাসপাতালে এ-গ্রেডের ফার্মাসিস্ট নিয়োগের বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঝেমধ্যে ফার্মেসি, ক্লিনিক ও হাসপাতালে অভিযান চালান। এ সময় জেল-জরিমানার পাশাপাশি দোকান সিলগালা করে দেওয়া হয়। তারপরও নকল ওষুধ বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক, ঘুমের ওষুধ ও যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট বিক্রিও চলছে। তাই এসব বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে সুদূরপ্রসারী সমাধান মিলবে না। ফার্মেসিতে এ-গ্রেডের ফার্মাসিস্ট নিয়োগের পাশাপাশি নকল ওষুধ উৎপাদন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা করা গেলে যাঁরা মান বজায় রেখে ব্যবসা করতে পারবেন, তাঁরাই এ পেশায় আসবেন।

মিজান শাজাহান: সাংবাদিক
mizanshajahan@gmail.com