মার্কস ও এঙ্গেলস দু'জনেই কলাম লিখতেন। রবীন্দ্রনাথ লিখতেন কিনা, জানি না। ১৮৪৭ সালে কমিউনিস্ট ইশতেহারে বলা আছে- 'মানুষের যেসব বৃত্তিকে লোকে এতদিন সম্মান করে এসেছে, সশ্রদ্ধ বিস্ময়ের চোখে দেখেছে, বুর্জোয়া শ্রেণি তাদের মাহাত্ম্য ঘুচিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসাবিদ, আইনবিশারদ, পুরোহিত, কবি, বিজ্ঞানী- সবাইকে এরা পরিণত করেছে তাদের মজুরিভোগী শ্রমজীবী রূপে।' 'শাইলকের বাণিজ্য বিস্তার' উপন্যাসে শাইলক ভবিষ্যৎ কিনতেন। আমরা প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের 'আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাখরখানি/ বেচো না বেচো না বন্ধু তোমার চোখের মণি' গাইতাম। আমাদের পূর্বপুরুষরা চোখের মণি বেচবেন না বলে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। আমরা ফুলবাড়ী আন্দোলনে ছিলাম।

শোনা যায়, বিদেশে টাকা দিয়ে লবিস্ট নিয়োগ করা হয়। এই লবিস্টরা তো এক ধরনের বুদ্ধিজীবী। তাঁদের কথা ও লেখালেখিতে আপনার ফায়দা হলে কড়ি কেন ফেলবেন না? উকিলও তো তা-ই। কানাঘুষা আছে, তারা নিয়োগকৃত দলীয় ফেসবুকার। সেই জানাগুলো ছিল তাত্ত্বিক। এর আগেও বন্ধুরাষ্ট্র সম্পর্কে একই মন্ত্রণালয় থেকে সত্য উচ্চারণ এসেছিল। এবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খোলাখুলি ঘোষণা করল। আমরা তত্ত্ব থেকে বাস্তবের দুনিয়ায় হাজির হলাম।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিদেশে নেতিবাচক প্রচারণা বন্ধ ও ইতিবাচক প্রচারণার জন্য 'অভিবাসী কূটনীতি' নামে নতুন অধিশাখা সৃষ্টির প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ওই বৈঠকে বলেছিলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে আর্টিকেল লেখার মতো দক্ষ জনবল না থাকায় সম্মানী দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কলামিস্টদের দিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক আর্টিকেল লেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু ভালো আর্টিকেল লেখার মতো ভালো কলামিস্টের সংখ্যাও খুব কম। আগামী দেড় বছরে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী শক্তিগুলো সোচ্চারভাবে সমালোচনায় মেতে উঠতে পারে। তাই ভালো কোনো কলামিস্ট থাকলে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানোর জন্য তিনি অনুরোধ করেন।

সম্মানী দিয়ে কাজ করানো কুইক রেন্টাল টাইপ হয়ে যায়। টেকসই পরামর্শ হচ্ছে- কলামিস্ট ক্যাডার পদ খোলা। এখানে গ্রেডিং থাকবে। লাইক-কমেন্ট হবে মানদণ্ড। ধরা যাক, যাঁর কলামে এক হাজার লাইক ও ২০০ কমেন্ট পড়বে, তাঁর এক ধরনের। আবার এর দ্বিগুণ হলে তাঁর সেই অনুপাতে গ্রেডিং বাড়বে। বেতনও হবে সেই অনুসারে। নইলে কামারের ঘা আর স্বর্ণকারের ঠুকঠুক সমান হয়ে যাবে।

কলামিস্ট নামে 'অধিশাখা' একক মন্ত্রণালয় হবে, নাকি আলাদা মন্ত্রণালয়; তা একটু ভাবতে হবে। নাকি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনেই হবে- এটা গুরুতর ভাবনা। আলাদা অফিস হবে কিনা; বিদেশ ভ্রমণ বোধ হয় রাখা উচিত; বছরে একবার ইউরোপ, একবার থাইল্যান্ড না হলে কি চলে? যেহেতু লেখক মানুষ তাঁরা; ব্যক্তিগত লাইব্রেরির জন্যও থোক বরাদ্দ রাখতে হবে। অন্তত জনপ্রতি লাখ পঞ্চাশেক টাকার বই তো কিনতেই হবে। ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনার চরে নুহাশপল্লী ধরনের বাড়ি তো থাকতেই হবে।

আইয়ুব খান তাঁর উন্নয়নের দশকে 'রাইটার্স গিল্ড' করেছিলেন। অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসাইন সভাপতি এবং ড. এনামুল হক ছিলেন সেক্রেটারি। লেখকরা পাণ্ডুলিপি জমা দিলেই কড়কড়ে নোট পেতেন। ওই পর্যন্তই। কিন্তু কলামিস্টদের দায় তো প্রতিদিনের। রাস্তাঘাটে ঝুঁকি। তাঁদের ব্যবস্থাটা আইয়ুব মডেলের চেয়ে উন্নত না হলে চলবে না। রাইটার্স গিল্ড দিয়ে উপন্যাস লেখা যায়; কলাম নয়। শওকত ওসমান লিখেছিলেন, 'বাদশাহ হারুনুর রশীদ, মোহর দিয়ে বান্দি কেনা যায়। কিন্তু হাসি? কক্ষনো না। না, না, না।'

এতে কী হবে? বাঙালিমাত্রই কবি- এই দুর্নাম অচিরেই লুপ্ত হবে। ঔপন্যাসিক মার্কেটে কলামিস্ট মার্কেট জায়গা করে নেবে। দিনরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা যে হারে এমপি থ্রি পড়ছেন; তাঁরা এবার মূল বই পড়বেন; লাইব্রেরি ওয়ার্ক কিছু বাড়বেন। কিন্তু পাঠাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে হাল, তাতে কি চলবে? প্রকাশকরা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবেন। পুতিনের দেশে নাকি ৭৪ শতাংশ পরিবারে লাইব্রেরি আছে। চীনেও পড়াশোনার হার বেড়েছে। উত্তর কোরিয়ার খবর জানি না।

যাঁরা ব্যাগের মধ্যে বাঁশি নিয়ে ঘুরে বেড়ান; সারাদিন ফেসবুকে মাথা গুঁজে থাকেন; তাঁরা তখন কবি জয় গোস্বামীর ভাষায়, 'ঘাড় গুঁজে রাত লিখতে লিখতে' কলামিস্ট হয়ে যাবেন। খাতাও শেষ হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে বিরোধী দলগুলো ক্ষমতায় এলে তারাও নিশ্চয় এই ধারা অব্যাহত রাখবে। আমরা জ্ঞানভিত্তিক জাতিতে পরিণত হবো।

নাহিদ হাসান: লেখক ও সংগঠক
nahidknowledge@gmail.com