বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারতের অংশগ্রহণ ক্রমে বাড়ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর উপলক্ষে আলোচনায় এসেছে ভারত থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানির প্রসঙ্গটি, যেটিকে বাংলাদেশের জন্য বড় প্রাপ্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি রপ্তানি করাটা আসলে কার সফলতা- ভারতের, নাকি বাংলাদেশের? সাধারণভাবে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য উভয়ের জন্যই লাভজনক হতে পারে যদি আমদানিকারক দেশে পণ্যটি পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদনের সুযোগ না থাকে আর রপ্তানিকারকের তা উদ্বৃত্ত থাকে এবং প্রতিযোগিতামূলক দরে পণ্যটির আমদানি-রপ্তানি করা হয়। যাচাই করা প্রয়োজন বাংলাদেশের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেমন কোনো পণ্য কিনা, যা ভারত থেকে আমদানি করা লাভজনক।

প্রথমে আসা যাক ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রসঙ্গে। বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রিড বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ২২ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। এই উৎপাদন ক্ষমতা সামনে আরও বাড়ছে। নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু হলে আগামী চার বছরের মধ্যে উৎপাদনক্ষমতা আরও ১৩ হাজার মেগাওয়াট বাড়বে। কিন্তু এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে ২০২২ সালের এপ্রিলে- ১৪ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট। গড় উৎপাদন গ্রীষ্ফ্মকালে ১৩ হাজার মেগাওয়াট, যা শীতকালে আরও কমে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটা বড় অংশ সারাবছর অব্যবহূত থাকে। কিন্তু বিদ্যুৎ না কিনলেও চুক্তি অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ বা ভাড়া দিতে হয়। ২০১০-১১ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ১২ বছরে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জই পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এ রকম একটা উদ্বৃত্ত উৎপাদন ক্ষমতার দেশ হয়ে বাংলাদেশের জন্য ভারত থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি কী করে লাভজনক হতে পারে, তা বোধগম্য নয়।

ভারত থেকে বর্তমানে যে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে, সেটারই এখন কোনো প্রয়োজন নেই। অথচ এ জন্য বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৯-২০ সাল পর্যন্ত দিতে হয়েছে ৬ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। তার ওপর ২৫ বছর ধরে ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি দেশের অর্থনীতির ওপর বোঝা আরও বাড়াবে। আদানির বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হলে দুই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে- হয় বাংলাদেশের আরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে, এমনকি সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে যদি আদানির চেয়ে কম দরে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় তাহলেও; অথবা আদানির বিদ্যুৎ না কিনেই বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রায় ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হবে। দুটো ঘটনার যেটিই ঘটুক, তা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে আদানির বিদ্যুৎ সস্তা হবে। অথচ আদানির বিদ্যুৎ কিনতে প্রতি ইউনিট ক্যাপাসিটি চার্জ পড়বে ৩ দশমিক ৮০ সেন্ট। অর্থাৎ আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ আনতে বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হবে প্রায় ৩ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ভারতকে দেওয়া ক্যাপাসিটি চার্জের দ্বিগুণ। ২৫ বছরে আদানিকে শুধু ক্যাপাসিটি মাশুল হিসেবে ৯৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা দিতে হবে বাংলাদেশের, যা তিনটি পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়ের চেয়েও বেশি। তবে ডলারের বিনিময় হার বাড়লে ২৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বলা হচ্ছে, ভারত থেকে পাইপলাইনে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করলে বেশ সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দেওয়া তথ্য অনুসারে, বিদেশ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি ব্যারেলে পরিবহন খরচ হয় ৩ ডলারের মতো। এর পর সেই তেল চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পরিবহনে খরচ হয় ব্যারেলপ্রতি ৪ থেকে ৫ ডলার। ফলে পরিবহন ব্যয় দাঁড়ায় সব মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ ডলার। আর ভারত থেকে পাইপলাইনে পরিশোধিত তেল এনে দেশের উত্তরাঞ্চলে সরবরাহ করতে পরিবহন ব্যয় হবে সাড়ে ৫ ডলারের মতো। অর্থাৎ ভারত থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি করলে ব্যারেলপ্রতি সাশ্রয় হবে দেড় থেকে আড়াই ডলারের মতো।

অন্যদিকে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল এনে দেশের পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করে ডিজেল উৎপাদন করা হলে সাশ্রয় হয় ব্যারেলপ্রতি ১১ ডলার! কাজেই তেল আমদানিতে সাশ্রয় করাই যদি উদ্দেশ্য হয়; তাহলে ভারত থেকে পাইপলাইনে পরিশোধিত তেল আমদানির বদলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল এনে দেশের ভেতরে পরিশোধন করাই বেশি সাশ্রয়ী হবে। কিন্তু ভারত থেকে ব্যারেলপ্রতি দেড় বা আড়াই ডলার সাশ্রয়ে পরিশোধিত তেল আমদানির ব্যাপারে পাইপলাইন নির্মাণসহ যত তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে, ব্যারেলপ্রতি ১১ ডলার সাশ্রয় হতে পারত যে উদ্যোগ নিলে, সেই উদ্যোগ অর্থাৎ দেশের একমাত্র পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে তার উল্টোটাই ঘটছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি-ইআরএল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধনাগারের সক্ষমতা এত বছরেও ১৫ লাখ টন থেকে বাড়ানো হয়নি। তেল পরিশোধন ক্ষমতা ৩০ লাখ টন বাড়ানোর একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। আজও সে উদ্যোগ বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ নেই। সময়মতো ইআরএলের সক্ষমতা ১৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ লাখ টন করা হলে পরিশোধিত তেলের তুলনায় অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়ানো যেত। ফলে বছরে ২৪ থেকে ২৫ কোটি ডলার বা প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো, যা এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখত।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ইআরএলের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনে বেসরকারি রিফাইনারির মালিক ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেল আমদানি করে; বেসরকারি খাতের এমন কিছু কোম্পানি জড়িত। কারণ ইআরএলের সক্ষমতা বাড়লে বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বাড়বে। সেই সঙ্গে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তেল আমদানিকারকরা ব্যারেলপ্রতি আমদানি খরচের ৯ শতাংশ সরকারি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হবেন। ভারতের কৌশলগত অর্থনৈতিক স্বার্থ আর দেশীয় ব্যবসায়ীদের মুনাফার স্বার্থ কী করে এক বিন্দুতে এসে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে, তার একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে এই ঘটনা। ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক ছোট একটি দেশের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো কৌশলগত পণ্যের জন্য ভারতের মতো বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের ওপর এ রকম নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি বিপজ্জনক।

কল্লোল মোস্তফা: লেখক, প্রকৌশলী নির্বাহী সম্পাদক, সর্বজনকথা