দেশের মাঠ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি, বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা-ইউএনও মাঝেমধ্যেই নানা কারণে সংবাদ শিরোনামে উঠে আসেন। দুঃখজনকভাবে, এসব কারণের মধ্যে বেশিরভাগই থাকে নেতিবাচক। তাঁরা কখনও উপজেলা প্রশাসনের ওপর কর্তৃত্ব নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হন; আবার কখনও ঠুনকো অজুহাতে নাগরিকদের সঙ্গে উদ্ধত ও অশোভন আচরণ করেন। কখনও কখনও ইতিবাচক কারণেও তাঁরা সংবাদ শিরোনাম হন। দুর্নীতির আখড়া বলে পরিচিত উপজেলা ভূমি কার্যালয়কে জনবান্ধব করার চেষ্টা চালাতে গত এক যুগে বেশ কয়েকজন ইউএনওকে দেখা গেছে। তবে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ইউএনও সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে যে কারণে শিরোনাম হয়েছেন, তা এ ধরনের আলোচনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রোববার সমকালের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, শুক্রবার উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের মাংতাই হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত এক ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় প্রধান অতিথি ছিলেন ওই ইউএনও। চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ ট্রফি বিতরণের আগে তাঁর বক্তৃতার সময় পরাজিত দলের সমর্থকরা খেলার ফল প্রত্যাখ্যান করে ফের তা অনুষ্ঠানের দাবি জানায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইউএনও দুটো ট্রফিই টেবিলে আছড়ে ভেঙে ফেলেন। কী বলা যায় তাঁর এ আচরণকে- বালখিল্য? কারণ এ ধরনের আচরণ বালকদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। প্রায়ই দেখা যায়, কোনো পাড়া বা মহল্লার এক দল বালক যখন নিজেদের মধ্যে এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, তখন পরাজিত দল মানি না মানি না বলে স্লোগান তোলে। এক পর্যায়ে কেউ যাতে জয়ের স্মারকটি নিজেদের দখলে নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে তাদের ট্রফিটি ভেঙে ফেলতে দেখা যায়।

তবে এটা যে একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার চরম অপেশাদার আচরণ- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। খেলার ফল মেনে নিতে এক দল আপত্তি জানানোর পর ইউএনও যদি ট্রফি দুটি নিজের জিম্মায় নিয়ে নিতেন; তারপর টুর্নামেন্ট কমিটির সঙ্গে বসে খেলাটি যাঁরা পরিচালনা করেছেন, তাঁদের বক্তব্য শুনে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা চালাতেন, তাহলে আমরা বলতে পারতাম, তিনি দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন। কিন্তু সে পথে না হেঁটে তিনি ট্রফি দুটি সবার চোখের সামনে ভেঙে ফেললেন; যেন প্রতিদ্বন্দ্বী দু'দলের খোলোয়াড়দেরই বলতে চাইলেন- যাও, কেউ তোমরা ট্রফি পাবে না। আসলে এর মধ্য দিয়ে আলীকদমের ইউএনও উপস্থিত জনতাকে তাঁর ক্ষমতাও দেখাতে চেয়েছেন! যদি পরাজিত দলের কেউ এ কাজটা করত, তাহলে তার ওপর প্রতিপক্ষ ঝাঁপিয়ে পড়ত- এটা চোখ বন্ধ করে বলা যায়। কিন্তু উপজেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা যখন এ গর্হিত কাণ্ডটি ঘটালেন; তা-ও রীতিমতো বলেকয়ে; তখন স্থানীয় মানুষ কষ্ট পেলেও এর বিরুদ্ধে জোরাল প্রতিবাদ করতে পারেননি। প্রতিবেদনমতে, ইউএনও ট্রফি দুটি ভাঙার আগে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন- 'আমি ট্রফিটা ভেঙে এখন খেলা শুরু করব।'

আলীকদমের ইউএনওর এ অগ্রহণযোগ্য আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হলে চারদিকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনও আলীকদমের জনগণকে অসম্মান করেছেন বলে অভিযোগ তুলে সংশ্নিষ্ট উপজেলা চেয়ারম্যান অবিলম্বে তাঁর প্রত্যাহার দাবি করেছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত রোববার পর্যন্ত ওই দাবির বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। আমরা মনে করি, অন্তত জনমনে প্রশাসনের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি গড়ে তোলার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি সুরাহা করা দরকার। বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো অনুসারে তৃণমূল মানুষের কাছে ইউএনও সরকারের চূড়ান্ত প্রতিনিধি। অনেকাংশে তাঁকে দেখেই তৃণমূলের মানুষ সরকারের ভালো-মন্দ বিচার করে। আরেকটি বিষয় হলো, এসব ইউএনও একদিন প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে যান; রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন। ফলে জনমুখী রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের পাঠ তাঁদের এখান থেকেই নিতে হয়। আর কে না জানে, জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান না থাকলে ওই ধরনের কাজ করা সম্ভব হয় না! প্রবাদে আছে- কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস। তাই আলীকদমের ইউএনওর ওই ট্রফিকাণ্ডকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

বিষয় : নোয়ালে বাঁশ সম্পাদকীয় মাঠ প্রশাসন

মন্তব্য করুন