পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় প্রবাহিত করতোয়া নদীতে রোববার বিকেলে মূলত তীর্থযাত্রী বহনকারী একটি নৌকাডুবির দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা আমাদের যেমন বেদনাহত, তেমনই বিক্ষুব্ধ না করে পারে না। বেদনার কারণ এই- করতোয়ার মতো স্বল্পপ্রবাহের একটি নদীতে শিশু-নারীসহ ৮৫ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি দুঃস্বপ্নেও অনুমান করা যায় না। সমকাল অনলাইনের সর্বশেষ তথ্যমতে, সোমবার বিকেল পর্যন্ত করোতায়া ও আত্রাই নদী থেকে অন্তত ৫০টি লাশ উদ্ধার করা রহয়েছে। এখনও নিখোঁজ থাকা ৩৫ জনের ভাগ্যে অভিন্ন পরিণতি ঘটার আশঙ্কাই প্রবল। কেউ জীবিত থাকলে সংকীর্ণ ওই নদীপথে জীবন্ত অবস্থায় তাদের সন্ধান মিলত, ধারণা করা যায়। ইতোমধ্যে পঞ্চগড় ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে ডুবুরি দল এসে তল্লাশি চালাচ্ছে। আমরা জানি, করতোয়া-আত্রাই নদী বাংলাদেশ পেরিয়ে ভারতেও প্রবাহিত। স্রোতে ভেসে যাওয়া লাশ সীমান্তের অপর পাশ থেকেও উদ্ধারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা চাইব, এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশটির প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হবে। শোকাহত স্বজনরা যাতে প্রিয়জনের লাশটা অন্তত পেতে পারেন। দুর্ঘটনায় এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানিতে শোক প্রকাশ করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। আমরাও শোক প্রকাশ করে প্রত্যাশা করি, স্বজনহারা পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সরকার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
আমরা জানি, ইতোমধ্যে দুর্ঘটনাকবলিত নৌকাটি উদ্ধার করা হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যে উদ্ধার অভিযানও সমাপ্ত হবে। কিন্তু এই দুর্ঘটনা ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলো সহজে মিলিয়ে যাবে না। বিশেষত এই প্রশ্ন করতোয়া ছাড়াও গোটা দেশের নৌপথ ধরেই উঠতে থাকবে- মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয় কেন? সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাচ্ছে- সর্বোচ্চ ৫০-৬০ জন ধারণক্ষম নৌকাটিতে দেড় থেকে দুইশ যাত্রী তোলা হয়েছিল। এটা ঠিক, স্বল্পপ্রবাহের নদী হলেও পাহাড়ি উৎসের কারণে উজানে বৃষ্টিপাত হলে করতোয়ায় স্রোত ও প্রবাহ আকস্মিকভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু এভাবে যদি অতিরিক্ত যাত্রাী তোলা না হতো, তাহলে হয়তো মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটত না। এই অবিমৃষ্যকারিতার দায় নেবে কে? এ ছাড়া দেশের যে এলাকাতেই হোক, যত ছোট নদী কিংবা নৌকাই হোক; নৌযানের ফিটনেস সনদের প্রশ্নটি এড়ানো যায় না। যদিও দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও হাওরাঞ্চলে চলাচলকারী বড় নৌপথ ও নৌযানেই আমরা ফিটনেস সনদের ঘাটতি দেখি; করতোয়ার প্রশ্নেও এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার অর্থ হলো, এ ধরনের আরও দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির জন্য অপেক্ষা করা।
বস্তুত প্রাণহীন দেহগুলো যেন নীরব ভাষায় আমাদেরই অপরাধী করে দেয়। করতোয়া নদীটি যেন অকর্তব্য তোয়া তথা দায়িত্বহীনতার প্রতীকী প্রবাহ হয়ে প্রশ্ন করতে থাকবে- কী দোষ ছিল নারী-শিশুসহ নিহত ব্যক্তিদের? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন- নৌপথে শৃঙ্খলা কি ফিরবে না? বাংলাদেশের বিস্তৃত নৌপথে প্রাকৃতিক কারণে জলযান দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু নেহাত কম নয়। কিন্তু করতোয়ার দুর্ঘটনাটি এমন সময় ঘটল, যখন সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের ফলে নৌ-দুর্ঘটনা ক্রমেই কমে আসছে। দুর্ঘটনা হ্রাস পাওয়ায় নজরদারি ও সতর্কতাও কি কমে এসেছে? এই দুর্ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে এটাও দেখায়- সব ধরনের নৌপথেই সতর্কতার বিকল্প নেই। এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না।
আমরা মনে করি, নৌপথে শৃঙ্খলা আনতে হলে ছোট-বড় সব পক্ষকে নিশ্চয়ই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। আমরা প্রায়শ এও দেখছি, বালুবাহী, যাত্রীবাহী, মাছধরা, খেয়া নৌযানের মধ্যে পারস্পরিক দুর্ঘটনা ঘটছে। সংখ্যায় কম হলেও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এসব 'ছোট' দুর্ঘটনায় নির্লিপ্ততা যে বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে- এতটি মূল্যবাণ প্রাণ হারিয়ে তা আরেকবার প্রমাণ হলো। আমরা নিশ্চয় চাই, করতোয়া দুর্ঘটনায় ক্ষতিক্ষগ্রস্ত পরিবারগুলো উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাবে। গঠিত তদন্ত কমিটি যাতে যথাসময়ে প্রতিবেদন জমা দেয় এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে ব্যাপারেও আমরা নজর রাখব। কিন্তু এসব করেই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। দেশের সব প্রান্তেই নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করতে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা। দেশের বিস্তৃত নৌপথজুড়ে যে ঐতিহ্যগত এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে; তাতে আর কান্নার রোল দেখতে চাই না আমরা। বরং দেখতে চাই, করতোয়ার নৌ-দুর্ঘটনাটিই হয়েছে বেদনার শেষ অধ্যায়।

বিষয় : সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন