ছদ্ম রূপান্তর বা 'সিউডোমরফোসিস' খনিজবিদ্যায় প্রচলিত একটি পরিভাষা, যা প্রায়ই খনিজ আহরণকারীদের বিভ্রান্ত করে। জার্মান দার্শনিক অসওয়াল্ড স্পেংগার গত শতকের বিশের দশকে পশ্চিমা বিশ্বের অবক্ষয়কে ব্যাখ্যা করতে সিউডোমরফোসিস ধারণা ব্যবহার করেছিলেন। বর্তমান ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও এখন এটা সত্য বলে মনে করা হয়। সিউডোমরফোসিস বা ছদ্ম রূপান্তর হলো অন্তর্নিহিত বাস্তবতার সঙ্গে বহির্বাস্তবতার চূড়ান্ত বৈপরীত্য। তিস্তা চুক্তি ঝুলে থাকতে থাকতে সাম্প্রতিক সময়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচ্যসূচিতেও স্থান না পাওয়ার সঙ্গে এর মিল খোঁজা নিশ্চয় বাড়াবাড়ি নয়।
বাংলাদেশকে অকৃত্রিম বন্ধু বলে দাবি করে ভারত। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও কখনও কখনও অভিন্ন দাবি করা হয়। অথচ তিস্তা নদী, যেটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম লাইফ লাইন, সেটি নিজেই মৃতপ্রায় এবং নদীর পানির অনিবার্য অংশ পাওয়া নিয়ে আলোচনাও মৃতপ্রায়।
জনতুষ্টিবাদী একদেশদর্শিতার আচ্ছন্নতা অনেক সময় কোনো কোনো দেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পেছন দিকে টেনে ধরে। এক দশক আগে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি হতে গিয়েও পিছুটান দেওয়ার ঘটনা আমাদের ভারত সম্পর্কে এমন কিছু ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক রাজনীতির শিকার তিস্তা চুক্তি- এ ধারণা এখন আবহমানতা পেতে বসেছে।
উইলসন সেন্টারের এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে- ক্রমবর্ধমান বিষাক্ত রাজনীতির ক্ষেত্রে, ভারতের ঘটনা, সবসময়ই যে তা ভারতের ভেতরেই থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে স্বার্থসংশ্নিষ্ট দেশগুলোতে। বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার মন্তব্য ভারত সরকার বেশ কড়াকড়িভাবে নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে। বিজেপি নেত্রীর মন্তব্যের পর বিলিয়ন ডলার আয়ের সংস্থানকারী আরব দেশগুলো যখন চড়া সুরে তাদের অবস্থান জানায়; তার প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। ভারতের অভ্যন্তরীণ ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের বিশাল ক্ষতি করতে পারে- কূটনীতিকদের এ আশঙ্কা অমূলক নয়। দিল্লি সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়ার চর্চা করতে শিখছে। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নানা কারণে বিশ্বজুড়ে ভারতের প্রভাব যখন বাড়ছে (অর্থনীতির শক্তির বিচারে ব্রিটেনকে ছাপিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির তালিকার প্রথম স্থানে উঠে এসেছে ভারত); বিদেশে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী হচ্ছে; তখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিদেশের অসন্তোষের কারণ হলে ঝুঁকি বাড়বে। কিন্তু রেমিট্যান্সের মতো সরাসরি অর্থনৈতিক কারণ আর অভ্যন্তরীণ বা প্রাদেশিক রাজনীতির কারণ নিয়ে সমান প্রতিক্রিয়া দেখায় না। তাই ইসলামবিরোধী মন্তব্যে যখন সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যে বাজার হারানোর শঙ্কা, তখন তা সামাল দিতে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে; কয়েক দশক ধরে অনিষ্পন্ন তিস্তা চুক্তি করতে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। ভারতের গা-ছাড়া ভাব যেন ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্টারপার্ট বাংলাদেশের দায়িত্বশীলদেরও গা-সওয়া হয়ে গেছে।
দীর্ঘ এক যুগের বিরতির পর বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) ৩৮তম বৈঠক হয়েছে। ১২ বছর জেআরসির বৈঠক বসেনি। কিন্তু বাণিজ্য ও ট্রানজিট নিয়ে বৈঠক এত ঘন ঘন হয় যে, তা আর অভিঘাত আনে না। অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, পলিমাটি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ও তার পানির গতিপ্রবাহ ঠিক রাখা, নদীর তীর রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহমত হয়ে একযোগে এগোনো- বৈঠকে না বসলে সম্ভব হতে পারে না। বন্ধ থাকা জেআরসির আলোচনা নতুনভাবে শুরু হওয়াকে এই আলোকেই দেখতে হবে। যেন এক যুগ পর বৈঠক হওয়াটাই প্রাপ্তি!
নদীর পানি নিয়ে অসন্তোষ দুনিয়ায় সব পক্ষ সমানভাবে দেখে না। এ অঞ্চলের চিন্তকরা মনে করেন, নদীর পানি নিয়ে অসন্তোষে বহু মেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হবে, যেখানে অনেক আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র থাকবে। আন্তর্জাতিক উদারনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতার সংকট বা ঘাটতি সবসময়ই ছিল। তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা থামাতে দুই দেশের অধিকর্তারা এই নসিহত দিয়ে থাকেন, স্বল্প মেয়াদে কোনো অর্জন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ক্ষেত্রে প্রায়ই ফলপ্রসূ হয় না।
রাজনৈতিকভাবে অস্থির, অর্থনৈতিকভাবে ভগ্নপ্রায় পাকিস্তান আর বিশ্বঅর্থনীতির নতুন শক্তির ভরকেন্দ্র সম্প্রসারণবাদী (ভারত প্রায়ই চীনকে এই অভিধা দিয়ে থাকে) চীন- এ দুই দেশ নিয়ে ভারত ভূরাজনৈতিকভাবে সবসময়ই এক ধরনের অস্থিরতায় থাকে। এই অস্থিরতা আর অস্বস্তির বিপরীতে একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, যে কিনা কখনও তেমন চিন্তার কারণ হয়নি ভারতের। এই নির্বিবাদ আচরণই অনুঘটক কিনা বাংলাদেশকে 'টেকেন ফর গ্রান্টেড' হিসেবে ধরে নিতে?
তিস্তা ও অন্যান্য নদী নিয়ে ভারতের আচরণ বুঝতে গিয়ে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, ভারত যেভাবে চিন্তা করে, তার চেয়ে একেবারে মৌলিকভাবে ভিন্ন অবস্থান বাংলাদেশের। নদী নিয়ে কোনো ঐকমত্যে আসতে না পারার জন্য দিল্লির হাইড্রো-হেজিমোনিক মানসিকতার সম্প্রসারণ চেষ্টাকে দোষ দেওয়া যায়। নদী নিয়ে দিল্লির মৌলিক কৌশলগত অবস্থানও ঢাকার বিপরীত।
ব্যারাজমাত্রই স্বাভাবিকতার বিরুদ্ধতা। অস্তিত্বশীল সব ব্যারাজই, তা হোক ভারত কিংবা বাংলাদেশের; ধ্বংস সাধন করে করে প্রাণ-প্রকৃতির। উজানের বাঁধে বাধা পড়া পানি নদীগুলোকে স্রোতশূন্য করেছে। অরণ্যবাসীকে ছিন্নমূল করেছে এবং এই প্রাণসংহারী ব্যবস্থা কখনও ব্যবসায়ীদের ইন্ধনে কখনও রাষ্ট্রীয় ইন্ধনে। দেবেশ রায়ের 'তিস্তাপারের বৃত্তান্ত'ও তিস্তা ব্যারাজ সিস্টেমের বিরুদ্ধে একটা শৈল্পিক চিৎকার। এই প্রত্যাখ্যানের রাত ধরে বাঘারু মাদারিকে নিয়ে হাঁটুক, হাঁটুক, হাঁটুক...। 'তিস্তাপারের বৃত্তান্ত' এভাবেই শেষ করেছিলেন দেবেশ রায়। দেবেশ রায় তো শেষ করেছিলেন। কিন্তু আবহমান বাঘারু মাদারিদের অপেক্ষা শেষ হয় না রাষ্ট্র্র্রে রাষ্ট্রে চুক্তি হয় না বলে।
এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
adv.mmkzaman@gmail.com