দেশের আদালতে 'মামলাজট' নিয়ে হতাশাজনক চিত্রের মধ্যেও ময়মনসিংহ বিভাগ শতভাগ মামলা নিষ্পত্তির যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, সেটি উৎসাহব্যঞ্জক। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিভাগটির চার জেলার আদালতে হওয়া মামলা নিষ্পত্তির পরও পুরোনো প্রায় ৪ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রশাসনিক সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ময়মনসিংহ বিভাগ মামলা নিষ্পত্তির যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তা অন্যদের জন্য অনুসরণযোগ্য।
আমাদের মনে আছে, ২০১৪ সালেও পাইলট প্রকল্পের আওতায় সোয়া লাখ মামলা নিষ্পত্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের জেলা আদালত। ময়মনসিংহ বিভাগের বিদ্যমান সফলতার পেছনে বর্তমান প্রধান বিচারপতির অবদানও অনস্বীকার্য। এ বছরের প্রথম দিন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি মামলাজট কমাতে উদ্যোগী হন এবং জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে আট বিভাগের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের আটজন বিচারপতির নেতৃত্বে পৃথক মনিটরিং কমিটি গঠন করেন।
সুপ্রিম কোর্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বর্তমানে উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা প্রায় ৪২ লাখ। আমরা দেখছি, প্রতিদিন যে হারে মামলা হচ্ছে, সেই হারে নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলাজট বেড়েই চলেছে। আমরা জানি, মামলাজট কমাতে ইতোমধ্যে সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সে কারণে সার্বিকভাবে মামলা নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তাতে প্রমাণিত- সব পক্ষ আন্তরিক হলে মামলাজট কমানো সম্ভব।
এটা স্পষ্ট, ময়মনসিংহ বিভাগে শতভাগ মামলা নিষ্পত্তির জন্য বাড়তি কোনো বিচারক নিয়োগ দিতে হয়নি। এর পরও যেভাবে তাঁরা সফল হয়েছেন, তাতে সেখানকার বিচারকদের সদিচ্ছার বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে আইনজীবীসহ আদালতসংশ্নিষ্ট সবার ভূমিকাও স্বীকার করতে হবে। অন্যান্য বিভাগও ময়মনসিংহ মডেল অনুসরণ করলে মামলাজট অনেকাংশে কমে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রতিদিনের মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টিতে জোর দিতে হবে, যাতে নতুন করে আর মামলাজট তৈরি না হয়। এর পর অগ্রাধিকার অনুযায়ী পুরোনো মামলাগুলোতে নজর দিলে ধীরে ধীরে মামলাসংখ্যা কমে আসবে।
অস্বীকার করা যাবে না, মামলাজট বাড়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের দুর্বলতাও ভূমিকা পালন করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমানে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনার হলে শাস্তির বিধান রাখায় অহেতুক মামলা করা বন্ধ হয়নি। সে জন্য গত কয়েক বছরে এই একটি ধারায় আদালতে লাখ লাখ মামলা হয়েছে। একই সঙ্গে হয়রানিমূলক মামলার বিষয়েও মনোযোগ দেওয়া চাই। অহেতুক হয়রানিমূলক মামলা করা হলে মামলাকারীকে জবাবদিহির মধ্যে আনা প্রয়োজন। তা না হলে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা আদালতে আরও জট বাড়াবে। সাক্ষ্য গ্রহণ জটিলতায় অনেক সময় মামলা নিষ্পত্তি হতে দেরি হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম কীভাবে দ্রুত সম্পন্ন করা যায়, সেটিও ভাবতে হবে। তবে মামলা অনুপাতে নিষ্পত্তির হার বাড়াতে আদালতে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়ার বিকল্প নেই। বিদ্যমান আইন সংশোধনের পাশাপাশি বিচারাধীন মামলার তালিকা করে নির্ধারিত সময় বেঁধে দিয়ে নিষ্পত্তির বিষয় তদারকি করা দরকার। মামলায় দীর্ঘসূত্রতা ও জট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি-এডিআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মাধ্যমে আদালতের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিরোধ সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব। সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দেওয়ানি কার্যবিধি এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে এতে এডিআরের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মানুষকে এ পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে এর প্রচার আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
আমরা জানি, 'জাস্টিস ডিলেইড ইজ টু জাস্টিস ডিনাইড' বা বিচারে দেরি করা মানে ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করা। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থেই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি। ২০০৭ সালের নভেম্বরে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মামলাজট কমানো। বাস্তবে এ সময়ের মধ্যে বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিচারকের সংখ্যা বাড়লেও মামলাজট তেমন কমেনি। এখন দেশের অন্যান্য বিভাগও যদি ময়মনসিংহের পথ অনসরণ করে, তাহলে বিলম্বে হলেও মামলাজট কমে আসতে পারে।