বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটা সময়ে ছাত্র আন্দোলন ছিল সম্মিলিত দাবি আদায়ের আন্দোলন। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভেদ থাকলেও শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রশ্নে তাঁদের একমত হওয়ার মতো নজির খুঁজলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু গত কয়েক দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের ক্ষমতা প্রদর্শন, বল প্রয়োগ, বিরোধীদের ওপর হামলা ও ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের সহজ রাস্তা। অন্যদিকে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো হয়ে পড়েছে নিজ দলের স্লোগানধর্মী। এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের দেখা যায় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের গানে সুর মেলাতে। এমন ঘটনার সর্বশেষ নজির দেখা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। আর ছাত্রলীগকে দেখা গেল মারমুখী ভঙ্গিতে। গত সপ্তাহে অবশ্য ছাত্রলীগ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জায়গাজুড়ে ছিল। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দলে বিশ্ববিদ্যালয়টির পরীক্ষা ও ক্লাস বন্ধ করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের সংঘাতে এমন সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যা নারীর জন্য অবমাননাকর।

এসব ঘটনার মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। ২৭ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার পথে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এ হামলার শিকার হন। হামলায় ঢাবি ছাত্রদল সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল, সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামসহ ১৫ জন আহত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হল ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে এ হামলা হয়েছে। আহতদের মধ্যে সাতজনের মাথা ফেটে গেছে (সমকাল, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২)। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ছাত্রদল ঢাবি শাখার নতুন কমিটির নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে গণমাধ্যমকে জানান। এ তথ্য প্রচার হলে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, ছাত্রলীগ নেতারা শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেবেন। ঘটনার দিন বিকেল ৩টা থেকেই মধুর ক্যান্টিনে জড়ো হতে থাকেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বিকেল ৪টার দিকে নেতাকর্মীদের নিয়ে ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে ৩০ দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি উপাচার্যের হাতে তুলে দেন। এ সময় বিভিন্ন হল ছাত্রলীগের নেতারা উপাচার্যের কার্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছিলেন। ছাত্রলীগের একটা অংশ অবস্থান নেয় এ এফ রহমান হলের সামনে। এক পর্যায়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের দেখামাত্র তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়।

এই হামলার বিষয়ে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, 'হত্যার উদ্দেশ্যেই ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা করেছে। আহত অধিকাংশ নেতাকর্মীর মাথায় আঘাত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক উপাচার্য স্যারের আমন্ত্রণে আমরা সেখানে যাচ্ছিলাম। আমাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম। ছাত্রলীগ দুপুর থেকেই শোডাউন, মিছিল ও মহড়া দিচ্ছিল। এর পরও আমরা উপাচার্য স্যারের কথায় অল্পসংখ্যক লোকজন নিয়ে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম। আমাদের ওপর এই হামলার দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই নিতে হবে। উপাচার্য কেন আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ছাত্রলীগকে দিয়ে মার খাওয়ালেন?' (সমকাল, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২)

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক হচ্ছেন উপাচার্য। এটা ছাত্রদলের এই নেতা যেমন জানেন, আমরাও তা-ই জানি। কিন্তু বর্তমানে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যের দিকে তাকালে আমরা এর উল্টো চিত্রই দেখতে পাই। এখানে উপাচার্য হতে হলে প্রথমেই যেটা দরকার সেটা হলো, শাসকদলীয় আনুগত্য। আমাদের উপাচার্যদের কথা বলতে গিয়ে আহমদ ছফার 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাসের দিকে তাকানো যেতে পারে। গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসটি একজন উপাচার্যের গোলামি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির নোংরা চিত্র। উপন্যাসে চিত্রিত উপাচার্য আবু জুনায়েদ এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে ম্লান হয়ে যাবেন বলে মনে করি। যখন দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হাতে মার খাওয়া ছাত্রদল সম্পর্কে উপাচার্য আখতারুজ্জামান বলছেন, 'অনেক সময় আন্তঃসম্পর্কের ঘাটতি থাকলে, সমন্বয়ের অভাব থাকলে অনাহূত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। আমি তাদেরকে আসতে বলেছি। শিক্ষক হিসেবে তো অনেক কিছু বর্তায়। আমি তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছি- তোমরা সমন্বয় করে আসো। এতে যদি সংগঠনের কোনো শিক্ষার্থীর আশঙ্কা থাকে, আমাদের জানালে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেত। প্রক্টরকে বিষয়টি দেখতে বলেছি।' (সমকাল, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২)।

উপাচার্যের বক্তব্য এবং ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের বক্তব্য যেন একই সুরে মেলানো :'তারা ভিসি স্যারের সঙ্গে দেখা করতে পারে। তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। তাদের ফোবিয়া আছে- তারা মার খেলে মনে করে, ছাত্রলীগ তাদের মেরেছে। এখানে ছাত্রলীগের বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের ওপর যারা হামলা করেছে, তাদের স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে। এখানে হামলাকারীরা ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী বলে অনেককেই চিহ্নিত করা গেছে। তার পরও এই হামলার ঘটনাকে অস্বীকার করা ছাত্রলীগ কি তবে আমাদের জিন-ভূতে বিশ্বাস রাখতে বলছে?

গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল এমন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মার খেল, যখন দেশের রাজনীতির ময়দান উত্তপ্ত। সভা-সমাবেশ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পুলিশের টিয়ার গ্যাসের শেল, গুলি, প্রাণহানির সঙ্গে ফিরে এলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেশের বৃহৎ দুই ছাত্র সংগঠনের সংঘাত। ছাত্রদলের মুরব্বি বিএনপি নেতারা বলছেন, আগামী দিনে ছাত্রদলকে দেশে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, আন্দোলনের নামে দেশের কোথাও সহিংসতা বরদাশত করা হবে না। সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের, গণতন্ত্রের শত্রুদের কঠোর হাতে মোকাবিলা করা হবে।

এভাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই ও সহিংসতা প্রতিহত করার ঘোষণায় আগামীর রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হবে- এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।

এহ্‌সান মাহমুদ: সমকালের সহসম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক