মানুষ সঠিক তথ্যের জন্য মূলধারার সংবাদমাধ্যমেই আস্থা রাখতে চায়। এ জন্য সংবাদমাধ্যমগুলো সেল্কম্ফ রেগুলেটরি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পেশাদারিত্বপূর্ণ সাংবাদিকতার চর্চা করতে পারে। মিডিয়া সেল্কম্ফ রেগুলেশন হলো মিডিয়ার জন্য নির্ধারিত কিছু নিয়ম বা বিধিবিধান, যেগুলো মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো মেনে চলবে। এটি রাষ্ট্র বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ থেকে প্রণীত আইনকানুন থেকে একেবারে আলাদা। সংবাদমাধ্যম একক বা সামষ্টিকভাবে নিজেদের জন্য নিজেদের স্বার্থে সেল্কম্ফ রেগুলেশন চালু করতে পারে।

সূচনালগ্ন থেকেইে সাংবাদিকতা বিভিন্ন রকম সংকট ও সমস্যা নিয়েই এগিয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন কারণে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা এখনও গুরুতর চাপের মধ্যে। সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, পাঠক-দর্শক-শ্রোতাপ্রিয়তা এবং পেশাগত আদর্শ ও মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে এসব বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিভিন্ন সমস্যা, প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা, সীমাবদ্ধতার কারণে সাংবাদিকতার যথার্থ চর্চা বিঘ্নিত হচ্ছে।

উন্নয়ন সংস্থা এমআরডিআই পরিচালিত এক জরিপের ফল এমন ধারণা দেয়- বাংলাদেশেও সাংবাদিকতা বিভিন্ন কারণে জনসাধারণের আস্থা হারাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক নীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের জানার অধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত এই গুরুত্বপূর্ণ পেশা স্বমহিমায় টিকে থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবনার দাবি রাখে। নাগরিকের আস্থা ফিরে পেতে দেশের সংবাদমাধ্যমকে দক্ষতার সঙ্গে ও কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে হবে; একই সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবেও টিকে থাকতে হবে।

এ দুই লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টেকসই সাংবাদিকতা তথা 'সাসটেইনেবল জার্নালিজম' ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এ-বিষয়ে প্রস্তাবিত একটি সাধারণ মডেলে অনুমান করা হচ্ছে- মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার চর্চা সংবাদমাধ্যমের প্রতি যেমন জনআস্থা বাড়াবে, তেমনই ব্যবসায়িক সাফল্যের দিকেও নিয়ে যাবে।

এই টেকসই সাংবাদিকতার ধারণা টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা জানি, সমাজের সর্বস্তরের উন্নয়নের মাধ্যমে একটি ন্যায়বিচার ও সমতাভিত্তিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাওয়াই হলো টেকসই উন্নয়ন। জাতিসংঘের নেতৃত্বে ২০১৫ সালে পৃথিবীর ১৯৫টি দেশ টেকসই উন্নয়নের যে ১৭টি লক্ষ্যমালা তথা 'সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস' (এসডিজি) নির্ধারণ করে, তা এখন 'এজেন্ডা ২০৩০' নামেও পরিচিত। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ-প্রকৃতি অক্ষত রেখেই সামাজিক ন্যায়বিচার, সাম্য ও উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর এ উন্নয়নের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে সংবাদমাধ্যমের সুরক্ষা তথা স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্যই দরকার টেকসই সাংবাদিকতা।

উল্লেখ্য, এসডিজি ১৬.১০-এ তথ্যে জনসাধারণের প্রবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতা তথ্যদাতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন না করলে সার্বিকভাবে স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারবে না।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে পিটার বার্গলেজ, আলরিকা ওলাউসন ও মাট ওটস্‌ সম্পাদিত 'হোয়াট ইজ সাসটেইনেবল জার্নালিজম? ইনটিগ্রেটিং দ্য এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক চ্যালেঞ্জেস অব জার্নালিজম' শিরোনামে পুস্তকটি টেকসই সাংবাদিকতা ধারণাটি সংহত করতে ভূমিকা রেখেছে। এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণা করা উচিত বলেও যুক্তি তুলে ধরা হয় সেখানে। তাঁরা যুক্তি দেন- অনিয়ন্ত্রিত বাজারভিত্তিক পুঁজিবাদের ব্যর্থতার কারণে বিশ্বব্যাপী একটি বিশেষ সমাজের উত্থান এবং সাংবাদিকতার মানের ক্রমাবনতি এই পেশার চিরায়ত ভূমিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এ দুটি সমস্যাকে তাঁরা আসলে স্থায়িত্বশীলতার চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করেন। বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ ও সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে বলেও মত দেন। তাঁরা মনে করেন, পেশাদার সাংবাদিকতাকে নিজস্ব নতুন পথ খুঁজে বের করতে হবে। বৈশ্বিক স্থায়িত্বশীলতা চ্যালেঞ্জ ও নতুন নতুন জটিলতাই সাংবাদিকতাকে এই নতুন পথ দেখাবে এবং ব্যবসায়িক ও পেশাগত চর্চা উভয় দিক থেকে মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার পুনর্জন্ম ঘটবে।

টেকসই সাংবাদিকতার ধারণার অন্যতম প্রবক্তা লার্স ট্যালার্ট এটাকে পরিবেশ বা উন্নয়ন সম্পর্কিত স্থায়িত্বশীলতার অন্যতম চালিকাশক্তি বা হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেন। টেকসই সাংবাদিকতার জন্য স্বচ্ছতা একটি পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু সংবাদমাধ্যমের আধেয় বা বিষয়বস্তুই সাংবাদিকতার স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে না; এ জন্য সংবাদমাধ্যম বা এর পেছনের প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ।

টেকসই সাংবাদিকতার ধারণার আগেও অনুরূপ কয়েকটি ধারণা আলোচনায় এসেছে। যেমন- গঠনমূলক সাংবাদিকতা, সমাধানভিত্তিক সাংবাদিকতা, ইমপ্যাক্ট সাংবাদিকতা ইত্যাদি। সেগুলোতে সরকার, মিডিয়া ও নাগরিকদের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ব্যবধান বাড়ার কারণে সাংবাদিকতার ব্যবসা বা আর্থিক বিষয়াদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

টেকসই সাংবাদিকতার ধারণাটি বাংলাদেশে এখনও ব্যাপক পরিচিত নয়। তবে 'উন্নয়ন সাংবাদিকতা' নামে আরেকটি ধারণা আশির দশক থেকে প্রচলিত। উন্নয়ন ও উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কিত সংবাদ প্রতিবেদন এবং উন্নয়ন সম্পর্কে মানুষের মতামত সম্পৃক্ত করে চর্চা করাই হলো উন্নয়ন সাংবাদিকতা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কারণে এই ধারণা জনপ্রিয় হয়েছিল।

চলতি বছর এমআরডিআই-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, একমাত্র তথ্যভিত্তিক রিপোর্টিংই মিডিয়ার প্রতি মানুষকে আস্থাবান রাখে। অর্থাৎ পেশাদার চর্চার মাধ্যমে এ দেশে সাংবাদিকতা তথা সংবাদমাধ্যম আস্থা বা বিশ্বাস অর্জন করতে পারে। এর মধ্য দিয়ে তা পাঠক-দর্শক-শ্রোতাপ্রিয়তাও অর্জন করতে পারে। পরিবেশ-প্রকৃতি-পরিপ্রেক্ষিত সবকিছু ইতিবাচকভাবে বিবেচনায় নিয়ে যথার্থতা, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা, ভারসাম্য বজায় রেখে সংবাদমাধ্যম কাজ করলে পেশাগত আদর্শ ও মান বজায় রাখতে পারবে। ফলে ব্যবসায়িকভাবেও সংবাদমাধ্যম সুস্থির ভিত্তি পাবে। এর মধ্য দিয়ে দেশে স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের সঙ্গে সাংবাদিকতার যোগসূত্র রক্ষিত হবে এবং শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতাও স্থায়িত্বশীল হবে।

তবে বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় ঘুষ-দুর্নীতি, ব্যক্তিস্বার্থে সাংবাদিক তথা সাংবাদিকতাকে ব্যবহার, মালিক শ্রেণির মতাদর্শ, বাণিজ্যিক মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে সাংবাদিকতার ব্যবহার, আইনি ও জবাবদিহির সংকট, রাজনৈতিক বিভক্তি ও পক্ষপাতিত্ব, সেল্কম্ফ সেন্সরশিপ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সময়োপযোগী দক্ষ কর্মীর অভাব, দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার ঘাটতি, অপতথ্য, সুনির্দিষ্ট সম্পাদকীয় নীতিমালা ও আচরণবিধির অভাব ইত্যাদি সমস্যার কারণে সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বেরও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ফলে সাংবাদিকতার গুণমান রক্ষিত হচ্ছে না। এসব কারণে মানুষ সংবাদমাধ্যমে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না। এতে সংবাদমাধ্যম-সংবাদকর্মীর বদনাম হচ্ছে। গুজব সৃষ্টিকারীরা সেই সুযোগ নিচ্ছে আর সংবাদক্ষেত্রে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। স্থায়িত্বশীলতা হুমকিগ্রস্ত হচ্ছে।

মানুষ আবার সঠিক তথ্যের জন্য মূলধারার সংবাদমাধ্যমেই আস্থা রাখতে চায়। এ জন্য সংবাদমাধ্যমগুলো সেল্কম্ফ রেগুলেটরি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পেশাদারিত্বপূর্ণ সাংবাদিকতার চর্চা করতে পারে। মিডিয়া সেল্কম্ফ রেগুলেশন হলো মিডিয়ার জন্য নির্ধারিত কিছু নিয়ম বা বিধিবিধান, যেগুলো মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো মেনে চলবে। এটি রাষ্ট্র বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ থেকে প্রণীত আইনকানুন থেকে একেবারে আলাদা। সংবাদমাধ্যম একক বা সামষ্টিকভাবে নিজেদের জন্য নিজেদের স্বার্থে সেল্কম্ফ রেগুলেশন চালু করতে পারে। এ ব্যবস্থায় সাংবাদিকতার পেশাদার চর্চার দেখভাল, বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি, আচরণবিধি এবং দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের স্বার্থ দেখা হবে। গুণমান-সচেতন সাংবাদিকতার চর্চা এবং জনসাধারণের কাছে নিজেদেরকে দায়বদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষা থেকে এ ব্যবস্থা চালুর আকাঙ্ক্ষা উৎসারিত। এর মাধ্যমে আসলে নৈতিক চর্চার প্রসার ঘটে, যা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কিংবা মিডিয়াকে সাংবাদিকতার অগ্রহণযোগ্য অপব্যবহার থেকে রক্ষা করবে।

সরকারের তরফ থেকেও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক সব আইনকানুন-চাপ-বাধা থেকে গণমাধ্যমকে মুক্ত করতে হবে। তবে টেকসই সাংবাদিকতার জন্য সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে সংবাদমাধ্যমকেই। এ ক্ষেত্রে তারা সেল্কম্ফ রেগুলশন কার্যকর করতে পেশাগত আচরণবিধি প্রণয়ন করতে পারে; সম্পাদকীয় নীতিমালা নির্ধারণ করে জনসাধারণকে জানাতে পারে; নিজেদের আর্থিক বিষয়াদি জনসমক্ষে এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়ানো, বিশেষ করে পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও বর্তমান মিডিয়া প্রতিবেশের জন্য তাদের সক্ষম করে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ এবং উৎসাহ প্রদান করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ভোক্তাকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। পাঠক-দর্শক-শ্রোতাকে গণমাধ্যম ও এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে আরও জানাশোনা রাখতে হবে। ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিকের পার্থক্য বুঝতে হবে। এভাবে সংবাদক্ষেত্র, দর্শক-শ্রোতা-পাঠক, সরকার- সব পক্ষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ সাংবাদিকতার গুণমান বজায় রাখতে ভূমিকা রাখবে। এর ফলে সংবাদমাধ্যম সবার আস্থা অর্জনের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে সফল হবে। শেষ পর্যন্ত স্থায়িত্বশীলতা পাবে সাংবাদিকতা।

মো. মশিহুর রহমান: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়