১৯৫৫ সালের মার্চে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস প্রকাশ্যে চীনকে হুমকি দিলেন এই বলে যে, চীন যদি জাতীয়তাবাদী চীনাদের অধীন কুইময় ও মাতসু দ্বীপে বোমাবর্ষণ বন্ধ না করে, তাহলে আমেরিকা চীনের ওপর পারমাণবিক বোমা ফেলবে। শেষ পর্যন্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে বিষয়টি সুরাহা হয়। তবে পরবর্তী বছরের জানুয়ারিতে লাইফ ম্যাগাজিনে লেখা এক নিবন্ধে ডালেস বেশ গর্বভরে বললেন, ওই পারমাণবিক বোমার হুমকি ছিল আসলে একটা ব্লেকমেইল। তিনি বেশ কটাক্ষ করে লিখলেন, 'কেউ কেউ বলে থাকেন, আমরা নাকি যুদ্ধের কিনারায় চলে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ কথাটা সত্যি; তবে যুদ্ধের কিনারায় গিয়েও যুদ্ধ না করেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করাটা একটা দরকারি শিল্প।'

ব্রিংকম্যানশিপ বা জুজুর ভয় দেখিয়ে উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার কথাটা তখন থেকেই শুরু হয়। ডালেসের ওই ফাঁকা আওয়াজ দেওয়ার কৌশল তখন বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছিল। প্রায় সব সিনিয়র রাষ্ট্রনায়কের কাছে অত্যন্ত বিপজ্জনক এক কৌশল বলে মনে হওয়ায়, পুতিনের আগে আর কেউই তার পুনরাবৃত্তির চিন্তা করেননি। গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন বলেছেন, 'আমাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা হুমকির মুখে পড়লে রাশিয়া ও তার জনগণকে রক্ষায় আমাদের হাতে থাকা সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার থেকে আমরা পিছপা হবো না।' তিনি এও বলেছেন, 'এটা কোনো ফাঁকা আওয়াজ নয়।' ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলা চালানোর প্রাক্কালেও তিনি একইভাবে 'এ যুদ্ধে হস্তক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে' পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছিলেন।

আমাদের মনে আছে, ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল সংকটের সময় পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই দেশ- তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে এক মহাবিপর্যয়ের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার হুমকি দেননি; তিনি শুধু ওই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় বসিয়েছিলেন। আজকে আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা সবাই ভাগ্যবান এ কারণে যে, ক্রুশ্চেভ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, যারা উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিণাম সম্পর্কে যথেষ্ট সজাগ ছিলেন, সেদিন তাঁদের ওই মোরগ যুদ্ধের খেলায় এ ধরনের অস্ত্র ঢোকানো সমীচীন মনে করেননি।

তবে এটা অনস্বীকার্য যে, এ ধরনের প্রজ্ঞা পুতিনের কাছ থেকে আশা করা যায় না। ইউক্রেন যুদ্ধে পরাজয় ঘটলে রাশিয়ার হয়তো কিছুই হবে না, তবে পুতিন তাঁর ক্ষমতা হারাবেন; কারণ এ যুদ্ধে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত খ্যাতিকে বাজি ধরেছেন। কোনো বিবেচক রাষ্ট্রনায়ক একটা সীমিত উদ্দেশ্য হাসিল করার মানসে এ ধরনের জুজুর ভয় দেখানোর কৌশলও হয়তো নেবেন না। কিন্তু পুতিনের বেলায় এটা খাটে না। কারণ তিনি তাঁর ক্ষমতা ও জীবন রক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে দ্বিধা করবেন বলে মনে হয় না। রাশিয়ান এ একনায়ক এরই মধ্যে তাঁর ছোটবেলার একটা গল্প শুনিয়েছেন, যেখানে তিনি একটা বড় ইঁদুরকে সিঁড়ির কোনায় কোণঠাসা করার পর ইঁদুরটা পাল্টা আক্রমণ করে পালিয়ে গিয়েছিল। পুতিন বলেছেন, ওই ঘটনা থেকে তিনি একটা শিক্ষা নিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের পাঠকদের জন্য সম্প্রতি রজার কোহেন পুতিনের ওই শিক্ষাটা ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভিত্তিতে আমরা বিশ্বকে একটা প্রশ্ন করতে পারি- পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ একটা কোণঠাসা ইঁদুরকে কীভাবে ঠেকানো যাবে?

প্রশ্নটার স্পষ্ট উত্তর হবে- ইঁদুরটাকে কোণঠাসা কোরো না। জন মার্শেইমারের মতো বাস্তববাদীরা ইউক্রেনে সামরিক পন্থায় বিজয় অর্জনের চেষ্টা করার জন্য পাশ্চাত্যের সমালোচনা করেছেন। তাদের যুক্তি হলো, এ বিজয় পুতিন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবেন না। অবশ্য, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার সংক্রান্ত ব্ল্যাকমেইল ততদূর পর্যন্তই যাবে, যেখানে অপর পক্ষ নিজেকে গুটিয়ে নেবে। তবে পুতিনের লক্ষ্য শুধু একটা নিরপেক্ষ ইউক্রেন নয়; এ লক্ষ্য তিনি ২৩ ফেব্রুয়ারিই অর্জন করতে পারতেন। তিনি চান সেখানে একটা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত একটা পুতুল সরকার বসাতে। আর পশ্চিমারা এতে সায় দিলে বলতে হয়, তারা অসহনীয় এক মূল্যে শান্তি কিনতে চায়। যাই হোক, ইউক্রেন কিন্তু বাইরের কোনো সমর্থন না থাকলেও তার অস্তিত্বের সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। ইউক্রেনকে টিকে থাকতে হলে পুতিনের পরাজয় হতেই হবে। এ প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে ভালো সমাধান হতে পারে- পুতিন পরাজিত হলেন, তবে সে পরাজয় তাঁর জন্য কোনো দুর্যোগ ডেকে আনেনি।


এ অবস্থায় ইউক্রেন বিষয়ে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে যে জোট আছে, তার সামনে একটাই বিকল্প আছে; তা হলো জুজুর ভয়ের খাড়া ও পিচ্ছিল ঢাল বেয়ে খুব সতর্কতা ও সচেতনতার সঙ্গে এগোনো। পুতিনকে বোঝাতে হবে যে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে খুব সামান্য পরিসরেও যদি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পুতিনের ওই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে শুধু বলেছেন, এর জন্য রাশিয়াকে পরিণতি ভোগ করতে হবে; কিন্তু সে পরিণতির স্বরূপ সম্পর্কে এখনও কিছুই বলেননি তিনি। তবে তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান অনেকটা স্পষ্ট করেই বলেছেন, ওই পরিণতি হবে 'ভয়াবহ'। সিরিয়ার ব্যাপারে বারাক ওবামা কোনো লাল দাগ টানেননি; কারণ তিনি এমন কিছু বলতে চাননি, যা তিনি করতে পারবেন না। বাইডেন নিশ্চিতভাবে তাঁর পূর্বসূরির থেকে এ শিক্ষাটা নিয়েছেন।

তবে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে তাত্ত্বিক ম্যাথু ক্রোয়েনিগ আটলান্টিক কাউন্সিলে লিখেছেন, বাইডেনের উচিত সুনির্দিষ্টভাবে না হলেও প্রকাশ্যে একটা হুমকি দেওয়া, যাতে পুতিন এটা বোঝেন যে, ওয়াশিংটনও কোনো ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছে না। অবশ্য এটা মানতে হবে যে, এমন কোনো পারমাণবিক প্রতিশোধের কথা উচ্চারণ করা ঠিক নয়, যা আপনি কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত নন। কেনেডি এ অস্ত্র ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কারণ তাঁকে এমন একটা হুমকি সরাসরি মোকাবিলা করতে হয়েছে। আর বর্তমান হুমকিটা তেমন কিছু নয়। ক্রোয়েনিগের পরামর্শ হলো, ইউক্রেনকে বর্ধিত হারে অস্ত্র সরবরাহ করার পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর আরও অবরোধ দেওয়া হোক; সেই সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রুশ সেনাদের ওপর সীমিত পরিসরে প্রথাগত কিছু হামলা চালানো হোক।

তবে এ ধরনের তৎপরতার মুখেও পুতিন হয়তো ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থের ক্ষয়ক্ষতির হিসাবটাই করবেন। এ অবস্থায় পুতিনকে থামানোর একমাত্র পথ হতে পারে তাঁর শাসনের অবসান বা তা মৃত্যু নিশ্চিত করা। আর রাশিয়ায় আগ্রাসন চালানো ছাড়া যা নিশ্চিতভাবেই পাগলামোর নামান্তর- পাশ্চাত্যের পক্ষে পুতিনকে কার্যকরভাবে এমন ভয় দেখানো অসম্ভব। তবে পারমাণবিক হামলার হুমকি দেশগুলোর মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা প্রবাহ বয়ে দিচ্ছে; অথবা তাদের এমন এক খাড়া ঢালের গোড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, যেখান থেকে কল্পনাতীত ঘটনাবলি ঘটার শঙ্কা জাগছে। তাই শুধু পাশ্চাত্য নয়, সারা বিশ্বকেই পুতিনের হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

জেমস ট্রাউব: মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসির কলামিস্ট; ফরেন পলিসি থেকে ভাষান্তর সাইফুর রহমান তপন