দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে ক্রমান্বয়ে সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে, তাতে এর শেষ পরিণতি কী- তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে এত দিন যে বাগ্‌যুদ্ধ চলছিল, তা যেন মল্লযুদ্ধে রূপ নিতে যাচ্ছে। গড়িয়েছে তা লাঠালাঠিতে। সম্প্রতি বিএনপির প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে গেছে বেশ কিছু সহিংস ঘটনা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ৪ জন নিহত ও সহস্রাধিক আহত হয়েছেন। বলা নিষ্প্রয়োজন, বিরোধী দল বিএনপির নেতাকর্মীরাই বেশি আক্রান্ত। পাশাপাশি পুলিশের করা মামলায় দলটির কয়েকশ নেতাকর্মী নতুন করে আসামি হয়েছেন। গ্রেপ্তারও হয়েছেন অনেকে।

গত কয়েক বছর রাজনৈতিক অঙ্গন প্রায় নিস্তরঙ্গই ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির রাজপথে অনুপস্থিতি। তারা এ সময়ে নিজেদের সাংগঠনিক পুনর্গঠন বা পুনর্বিন্যাসেই ব্যস্ত থেকেছে; সরকারবিরোধী কোনো জোরালো কর্মসূচি দেয়নি। যদিও তারা সাংগঠনিক পুনর্গঠন কর্মসূচি এখনও সম্পন্ন করতে পারেনি। বরং কামিটি গঠন-পুনর্গঠন নিয়ে অনেক এলাকায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ঐক্য না থাকায় রাজপথে বড় কোনো কর্মসূচি তারা দিতে পারেনি। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মসূচি দিলেও তা দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় রাজধানীর নয়াপল্টনের সড়ক কিংবা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ ছাড়া প্রেস ক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আলোচনা সভায় অচিরেই 'সরকার পতন ও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে' নামার হুমকি অব্যাহত রেখেছে। বলা বাহুল্য, বিএনপির এ কর্মসূচি ও হুমকি-ধমকি শাসক দলের কাছে গুরুত্ব পায়নি। ফলে রাজপথ ছিল আওয়ামী লীগের একক নিয়ন্ত্রণে।

মাসখানেক ধরে বিএনপি বিভিন্ন দাবিতে সভা-সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে। কয়েকটি সমাবেশে লোকসমাগম বাড়তে থাকার এ পর্যায়ে সরকারি দলের মধ্যে এক ধরনের চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়। এতদিন তারা বিএনপিকে অবজ্ঞার চোখে দেখলেও এখন যেন একটু হিসাবের মধ্যে নিতে শুরু করেছে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, রাজপথে বিএনপিকে মোকাবিলার অঘোষিত কর্মসূচি নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

বিএনপির মিছিল-সমাবেশে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের হামলায় জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি উপলব্ধি করেই বোধ করি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নিজ দলের নেতাকর্মীকে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নেত্রীর নির্দেশ অমান্য করে যারা সহিংস ঘটনা ঘটাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্মর্তব্য, ইতোপূর্বে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, কর্মসূচি পালনে বিরোধী দলকে কোনো রকম বাধা দেওয়া হবে না। এমনকি তারা যদি মিছিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও যায়, তিনি তাদের চা দিয়ে আপ্যায়ন করবেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, প্রধানমন্ত্রীর সে কথায় সরকারের পুলিশ বাহিনী এবং দলের কর্মীরা খুব একটা কর্ণপাত করেনি।

সর্বশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর ড. মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি ছিল নবগঠিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির নেতৃবৃন্দের। কর্মসূচির খবর প্রচার হওয়ার পরপরই ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে ছাত্রদলকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। নির্ধারিত দিনে ছাত্রদলের ৩০-৩৫ জন নেতা নীলক্ষেত এলাকা দিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকতে গেলে ছাত্রলীগ কর্মীদের বেধড়ক পিটুনির শিকার হন। কেউ হয়তো বলতে পারেন, এক সময় ছাত্রদলও ছাত্রলীগকে এভাবে পিটিয়েছে। কিন্তু একটি খারাপ কাজকে রেফারেন্স হিসেবে টেনে আরেকটি খারাপ কাজকে জায়েজ করার চেষ্টা যৌক্তিক হতে পারে না।

এদিকে নানা জায়গায় হামলার শিকার হওয়ার পর বিএনপিও তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। তারা এখন মিছিল-সমাবেশে লাঠি বহন করছে। তবে লাঠির মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে নিচ্ছে এবং সংঘর্ষের সময় সেটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। কেউ কেউ বিএনপির এ কৌশলকে 'আত্মরক্ষার কৌশল' হিসেবে অভিহিত করলেও এটাকে সমর্থনের সুযোগ নেই। কেননা, সংবিধানে নিরস্ত্র অস্থায় নাগরিকদের সমবেত হওয়া এবং সভা-মিছিল করার অবারিত অধিকার দেওয়া হলেও সশস্ত্র অবস্থায় তা নিষিদ্ধ। লাঠিকে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ দণ্ড মনে হলেও সহিংসতায় এর ব্যবহার যে ভয়াবহ হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ছাড়া একটি রাজনৈতিক দলের মিছিলে জাতীয় পতাকার যথেচ্ছ ব্যবহার করা যায় কিনা- সে প্রশ্নও রয়েছে।

মিছিলে বিএনপির লাঠি বহনের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। বিএনপিকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে তিনি বলেছেন- এর পর লাঠির সঙ্গে জাতীয় পতাকা নিয়ে নামলে খবর আছে (৩০ সেপ্টেম্বরের পত্রিকা)। তবে বিএনপি এসব হুঁশিয়ারিকে পাত্তা দেবে কিনা, বলা মুশকিল। কেননা, লাঠির সুফল তারা পেয়েছে হাজারীবাগের সমাবেশে। ওই দিন হামলা করতে আসা আওয়ামী লীগ কর্মীদের তারা লাঠি দিয়ে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। এর পর হয়তো আইনগত কারণে তারা জাতীয় পতাকার পরিবর্তে লাঠির মাথায় দলীয় পতাকা বহন করবে। তাতে কি আসল সমস্যার সমাধান হবে?

গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ এবং এর মুক্তচর্চার জন্য প্রয়োজন সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ। রাজনীতিকরা মঞ্চ-মিডিয়ায় বাগ্‌যুদ্ধে একে অপরকে ঘায়েল করে জনসমর্থন নিজ নিজ পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করবেন- এটাই রাজনীতির চিরাচরিত রীতি। কিন্তু এখন সে রীতি বাদ দিয়ে রাজনীতিকে যেভাবে জোতদারদের চর দখলের মতো লাঠালাঠির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা কোনো সুস্থ চিন্তার পরিচায়ক নয়। রাজনীতিতে লাঠির ব্যবহার কী পরিণতি বয়ে আনতে পারে- এর দৃষ্টান্ত কিন্তু খুব বেশি পুরোনো হয়নি। সবাইকে শুধু ২০০৬ সালের লগি-বৈঠার নৃশংসতা এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ওয়ান-ইলেভেন আসার কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক