মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য হইতে প্রাণ হাতে লইয়া বাংলাদেশে আসিয়া সাময়িক আশ্রয় লওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কেউ কেউ যে কেবল আশ্রয়শিবিরেই থামিয়া থাকিতেছেন না; উহা বিভিন্ন সময়েই হাতেনাতে ধরা পড়িয়াছে। অকুস্থল কক্সবাজার-বান্দরবান জেলা হইতে দূরবর্তী জনপদগুলিতেও প্রায়শ এই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা আটক হইবার পর দেখা যায় যে, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ জনারণ্যে মিশিয়া যাইবার যাবতীয় নথিপত্রও তাহারা সংগ্রহ করিয়াছে। এমনকি সেইসব নথির সাহায্যে পাসপোর্ট করিয়া বিদেশে পাড়ি দিবার ঘটনাও বিরল নহে। বলা বাহুল্য, এই জালিয়াতিকর্ম তাহাদের একার পক্ষে সম্পাদন সম্ভব হইতে পারে না। রোববার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও প্রাঞ্জল ভাষায় বিবৃত হইয়াছে- ইহার নেপথ্যে রহিয়াছে বার ভূতের কারবার। প্রতিবেদনটিতে বলা হইয়াছে- কক্সবাজার পৌরসভার জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তা রোহিঙ্গাদের ভুয়া নাম-ঠিকানা, জন্মনিবন্ধন প্রদান করিতেছেন। এইসব নথি ব্যবহার করিয়া জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হইতেছে নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সহযোগিতায়। আর সব মিলাইয়া পাওয়া যাইতেছে পাসপোর্ট। বলা বাহুল্য, নিজভূমি হইতে উদ্বাস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতি 'মানবতা' প্রদর্শনার্থে এই সকল 'কর্ম' সম্পাদন হইতেছে না। নেপথ্যে যে মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেন ঘটিতেছে- সমকালের প্রতিবেদনেই তাহা স্পষ্ট। আমরা এই আশঙ্কাও অত্র সম্পাদকীয় স্তম্ভে একাধিকবার প্রকাশ করিয়াছি যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশি নাগরিকত্বপ্রাপ্তিতে সহায়তার নেপথ্যে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও থাকিতে পারে। উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে ভোটব্যাংক কিংবা লাঠিয়াল হিসাবে ব্যবহারের নজির কেবল বাংলাদেশেই রহিয়াছে- এমন নহে।

অর্থ কিংবা রাজনীতির অনর্থের কুফল হইয়াছে এই- রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন দূরে থাকুক, তাহারা জনস্রোতে মিশিয়া গিয়াও ক্ষান্ত হইতেছে না; বাংলাদেশি পাসপোর্ট বাগাইয়া বিদেশেও পাড়ি জমাইতেছে। অস্থায়ী শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্য হইতে কয়েক লাখের অধিক গত তিন বৎসরে 'উধাও' হইয়া গিয়াছে। মিয়ানমার হইতে আগত এইসব শরণার্থীর লইয়া কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সমন্বয়ক গ্রুপ আইএসসিজির বরাতে এমন তথ্য মিলিয়াছিল কয়েক বৎসর আগে। এতদিনে তাহা যে আরও বাড়িয়াছে, সন্দেহ কী? ইহাও মনে রাখিতে হইবে- বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর শিবিরত্যাগের তথ্য মিলিয়াছে কেবল নিবন্ধিতদের মধ্য হইতে। মিয়ানমারের সামরিক-অসামরিক সংস্থা ও গোষ্ঠীগুলোর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন হইতে প্রাণ বাঁচাইতে ২০১৭ সালের আগস্ট হইতে দফায় দফায় সীমান্ত অতিক্রমকারী এই জনগোষ্ঠীর শতভাগ নিবন্ধনের আওতায় আসিয়াছে- এমন দাবি করা আদৌ উচিত হইবে না। এতদ্‌ব্যতীত এইখানে আসিয়া নিবন্ধন-পরবর্তী সময়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের সংখ্যাও বিবেচনা করিতে হইবে। অর্থাৎ, অস্থায়ী শিবির হইতে স্থায়ী জনবসতিতে কিংবা বিদেশে চলিয়া যাওয়া রোহিঙ্গাগণের প্রকৃত সংখ্যা আরও অধিক। রোহিঙ্গাদের এইভাবে দেশে ও বিদেশে ছড়াইয়া পড়িবার প্রতিক্রিয়া আর্থ-সামাজিক দিক হইতে নেতিবাচক তো বটেই, নিরাপত্তার দিক হইতেও নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ।

আমাদের স্মরণে রহিয়াছে- ২০১৯ সালেই রোহিঙ্গাদের এনআইডিপ্রাপ্তি ও পাসপোর্ট তৈরির অঘটন শনাক্ত এবং ইহার নেপথ্যে একচি বৃহৎ চক্রের অস্তিত্ব উন্মোচিত হইয়াছিল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ প্রযোজিত জালিয়াতির এই আত্মঘাতী প্রবণতা যে অদ্যাবধি বন্ধ হয় নাই- আলোচ্য প্রতিবেদনটিই তাহার প্রমাণ। আমরা মনে করি- ইহা নিমজ্জিত হিমশৈলীর ভাসন্ত চূড়ামাত্র। জালিয়াতির জাল আরও বিস্তৃত বিধায়, তদন্ত ও অনুসন্ধানের পরিসরও বিস্তৃত করিতে হইবে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্টপ্রাপ্তি বিদেশের মাটিতে কী ধরনের বিপাক তৈরি করিতেছে; গত বছর জুলাই মাসে সৌদি আরবের পক্ষে ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার মেয়াদোত্তীর্ণ বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন করিবার 'চাপ' তাহা প্রমাণ করিয়াছিল। এই আশঙ্কা অমূলক হইতে পারে না- অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশি জনশক্তির অন্যান্য গন্তব্য হইতেও এমন চাপ আসিতে পারে বৈকি। রোহিঙ্গাদের লইয়া পরিস্থিতি যেন বাংলা ভাষায় প্রায় প্রবাদে পরিণত হওয়া 'আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান' রবীন্দ্রসংগীতেরই নামান্তর। এখন এই বিষক্ষয় যত দ্রুত করা যাইবে, ততই মঙ্গল।

বিষয় : বিষ পান সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন