১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় গণহত্যা বা জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে জোরালো ভূমিকা রাখতে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ৪৬ দেশকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন 'আমরা ৭১' এর প্রধান সমন্বয়কারী হিলাল ফয়েজীর নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশের ৪৬ দূতাবাসে তিন পৃষ্ঠার এই স্মারকলিপি পৌঁছে দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে পাকিস্তানি গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, গণহত্যায় জড়িত পাকিস্তানি বাহিনীর বিচার এবং ১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যা ও যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে দেশগুলোর সমর্থন চাওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচিতে সহযোগিতা দিচ্ছে পররাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এদিকে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়ে জনমত গঠনের লক্ষ্যে আজ সোমবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভার জাতিসংঘের হেডকোয়ার্টারে মানবাধিকার কমিশন কার্যালয়ে বিকেল ৪টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা) এবং ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকেল ৫টায় আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের সভায় বক্তব্য দেবেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থায়ী প্রতিনিধি মিজ সঞ্চিতা হক, সুইডেনের হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ আসিফ সাকের, অধ্যাপক ড. তাজিন মুরশীদ, সুইস ইন্টারস্ট্রেজি গ্রুপের পরিচালক ক্রিস ব্লাকবার্ন, লেখক দানিয়েল সেইদিল, কাশ্মীরি রাজনীতিবিদ সরদার শওকত আলি কাশমিরি, বেলুচ ভয়েস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুনীর মেঙ্গল।

একইভাবে ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত আলোচনা সভায় আয়োজক সংগঠন 'আমরা ৭১'সহ বিশিষ্টজন বক্তব্য দেবেন। গণহত্যার স্বীকৃতির দাবি আদায়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইউর্কের জাতিসংঘ ভবন ছাড়াও যুক্তরাজ্যের লন্ডন, কানাডার টরন্টো ও মন্ট্রিল, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিসহ বিভিন্ন শহরে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের চলতি অধিবেশনের ৫১তম সভায় ৩ নম্বর কার্যসূচিতে নথিভুক্ত রয়েছে। কার্যসূচি অনুযায়ী শিগগিরই জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর অংশগ্রহণে মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। গত জুলাইয়ে সুইজারল্যান্ডের প্রবাসী সংগঠন বাংলাদেশ সাপোর্ট গ্রুপ (বাসুগ) ও ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন (ইবিএফ) এবং বাংলাদেশি সংগঠন আমরা একাত্তর ও প্রজন্ম ৭১ গণহত্যার স্বীকৃতি-সংক্রান্ত প্রস্তাবটি জাতিসংঘে দাখিল করে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, 'কয়েকটি বেসরকারি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। তারা এর পক্ষে জনমত গঠনের জন্য দেশে-বিদেশেও কাজ করছে, এটি ইতিবাচক। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব কর্মসূচিতে সাপোর্ট দিচ্ছে। কূটনৈতিকভাবেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্য দিয়ে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।'

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিত ও বিস্তৃত গণহত্যা চালিয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তা আর কোথাও ঘটেনি। অথচ ৫১ বছরেও মেলেনি বাংলাদেশিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম জেনোসাইড বা গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি না মেলায় এখনও আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদেরও। সরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে উদ্যোগের কথা বলা হলেও তাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তবে এবার বেসরকারি ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে নেওয়া হয়েছে সমন্বিত কর্মসূচি।

এ ব্যাপারে আমরা ৭১-এর প্রধান সমন্বয়কারী হিলাল ফয়েজী বলেন, জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে আমরা চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে ৪৬ দূতাবাসে আমরা স্মারকলিপি দিয়েছি। আমরা চাই সরকার এই দাবি আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করুক।

বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকলেও জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস পালন করা হচ্ছে। ২০১৭ সালের ১১ মার্চ সংসদে ২৫ মার্চকে 'গণহত্যা দিবস' ঘোষণার বিষয়টি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আর্জেন্টিনা, হংকং, পোল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে। একাধিক বিদেশি গবেষকও একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ নামে একটি কোর্স চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও বছরজুড়ে গণহত্যাবিষয়ক বিভিন্ন ধরনের সংক্ষিপ্ত কোর্স ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুসারে ২০১৫ সাল থেকে ৯ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক জেনোসাইড স্মরণ দিবস পালিত হয়ে আসছে।