বিজয়ার শুভক্ষণে আমরা যখন সমকালের সম্পাদকীয় লিখিতেছি, তখন সারাদেশে দুর্গা দেবীর বিসর্জন সম্পন্ন হইয়া গিয়াছে। মণ্ডপ-মন্দিরে বর্ণাঢ্য উৎসবান্তে দেবী দুর্গা ভক্তদের পুষ্পাঞ্জলি-অর্ঘ্যে সিক্ত হইয়া ফিরিয়া যাইতেছেন কৈলাসের আপন ভুবনে। আমরা দেখিয়াছি, বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবে গত দুই বৎসর বহুলাংশেই নিষ্প্রাণ ছিল শারদীয় দুর্গোৎসব। তবে এইবার করোনার সংকট ও শঙ্কা কাটাইয়া ফিরিয়া আসিয়াছিল চিরচেনা সেই উৎসব। শরৎকালের শুভ্র মেঘ, শ্বেত কাশফুল আর স্বচ্ছ-শান্ত নদনদী তাঁহাকে বরণ করিয়া লইয়াছিল। দেবীর পূজারি ও অনুসারীদের দিনগুলি কাটিয়াছে পরমানন্দে। সুন্দর ও অর্থবহ জীবনের জন্য তাঁহারা কুড়াইয়া লইয়াছেন প্রেরণা। দেবীর বিদায়ে তাই বিষাদের ছায়া তাঁহাদের ঘরে ঘরে। কিন্তু জীবন বহমান; ছন্দে-সৃজনে ভরপুর। পুনর্বার অপেক্ষা সকলের দেবী আবার আসিবেন শিউলি-ঝরা পথ ধরিয়া। এই সময়ের মধ্যে পরিবার, সমাজ ও প্রিয় স্বদেশের জন্য নিজেদের নিয়োজিত রাখিবেন সৃষ্টিশীল ও উদ্যমী কর্মকাণ্ডে, যাহা লইয়া আসিবে সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি। 
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস- দেবী দুর্গা বারবার আসিয়া অশুভ শক্তির বিনাশ সাধন করিয়া যান। ধর্মমাত্রই অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়গান গাহিয়া থাকে। শারদীয় উৎসবের দিনগুলি তাই সহজেই পরিণত হয় ধর্ম-পেশা নির্বিশেষে সকলের মেলবন্ধনের উপলক্ষ। মণ্ডপে মণ্ডপে তাঁহারা ভিড় জমান; পরস্পর কুশল বিনিময় করেন। যাঁহার যেই রূপ সামর্থ্য; সহযোগিতার হাত প্রসারিত করিয়া থাকেন। আমাদের দেশে প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলি শত শত বৎসর ধরিয়া পালিত হইতে হইতে ধর্মীয় আবরণের বাহিরে এক ধরনের সামাজিক উৎসবের রূপ ধারণ করিয়াছে। যে কারণে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান দুইটি ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময়েও আমরা দেখিয়া থাকি, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হইবার পর অমুসলিমরাও মুসলিম প্রতিবেশী বা বন্ধুবান্ধবের বাড়ি বেড়াইতে কোনো দ্বিধাবোধ করেন না। খ্রিষ্টানদের বড়দিন এবং বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমাও ধর্মের সীমানা ছাড়াইয়া সর্বজনীন রূপ পাইয়াছে। এক সম্প্রদায়ের উৎসবে এইভাবে আরেক সম্প্রদায়ের মানুষের যোগ দেওয়ায় 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার'- এই চেতনাই যে দিন দিন শক্তিশালী হইয়া উঠিতেছে, তাহা আর বলিবার অপেক্ষা রাখে না। দুর্ভাগ্যবশত, গত বৎসর দুর্গাপূজার সময় প্রধানত স্থানীয় প্রশাসনের অসতর্কতার কারণে কিছুসংখ্যক দুর্বৃত্তের চক্রান্তে আমরা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দেশের বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বলিয়াছিল। উহার জের ধরিয়া প্রাণহানির মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটিয়াছিল। তবে আশার কথা হইল, গত বৎসরের যন্ত্রণা ভুলিয়া মানুষ এই বৎসর আবারও দুর্গাপূজার উৎসবে মিলিত হইয়াছে। ইহাতে এই উৎসবের সামাজিক শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে বলিয়া আমরা মনে করি।
এই বৎসর আমরা দেখিয়াছি, সারাদেশে অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হইয়াছে। স্বস্তির বিষয় হইল, আমাদের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এইবার উৎসব নির্বিঘ্ন করিতে সকল ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়াইয়া দিয়াছে। সর্বত্রই ছিল সতর্ক প্রহরা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও ছিল ব্যাপক। সেই জন্যই শারদীয় উৎসব আয়োজন হইয়াছে রেকর্ডসংখ্যক মন্দিরে। তবে এইবার দুর্গোৎসবের আনন্দে বেদনা হইয়া আসিয়াছে পঞ্চগড়ের নৌকাডুবি। মহালয়া উপলক্ষে তীর্থযাত্রীদের মধ্যে মন্দির-পথে নৌকাডুবিতে অন্তত ৭০ জনের প্রাণহানির খবর আসিয়াছে সংবাদমাধ্যমে। ইতোমধ্যে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিবার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছি। আমরা প্রত্যাশা করি, কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে উদাসীন থাকিবে না এবং ভবিষ্যতে পঞ্চগড়ে ঐ এলাকায় যাতায়াত নিরাপদ করিয়া তুলিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।
আমরা বিশ্বাস করি, দেবী দুর্গার বিসর্জনেও শেষ হইবে না শরৎ উৎসবের রেশ। বার মাসে তের পার্বণের এই দেশে সামনে রহিয়াছে আরও অনেক ধর্মীয় উৎসব। আমরা নিশ্চিত যে, এইসব অনুষ্ঠানও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হইবে। দুর্গোৎসব ঘিরিয়া প্রশাসনের সন্তোষজনক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বৎসরব্যাপী থাকিবে বলিয়াই আমাদের প্রত্যাশা। মঙ্গলবার হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সহিত শুভেচ্ছা বিনিময়কালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখিবার যে তাগিদ প্রধানমন্ত্রী দিয়াছেন, তাহা যথার্থ। আমরা জানি, বাংলাদেশের মানুষ সহনশীল। নানা ধর্মের আবেগ-অনুভূতি, রীতিনীতির প্রতি তাঁহারা যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করিয়া থাকেন। কোনো উগ্রবাদী অপশক্তি এই ঐতিহ্যে ছেদ ঘটাইতে পারিবে না।

বিষয় : সম্পাদকীয় দেবীর বিসর্জন

মন্তব্য করুন