'বিতর্কিত' ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সম্প্রতি রাষ্ট্রের ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে 'গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো' হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ৪ অক্টোবর গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে এ তালিকাকে 'প্রশ্নবিদ্ধ' ও 'বিভ্রান্তিকর' বলে উল্লেখ করেছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে 'গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো' বা 'ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার' বলতে বোঝানো হয়েছে- সরকার ঘোষিত কোনো বাহ্যিক বা ভার্চুয়াল তথ্য পরিকাঠামো, যা কোনো তথ্যউপাত্ত বা কোনো ইলেকট্রনিক তথ্য নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াকরণ, সঞ্চারণ বা সংরক্ষণ করে এবং যা ক্ষতিগ্রস্ত বা সংকটাপন্ন হলে জননিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বা জনস্বাস্থ্য, জাতীয় নিরাপত্তা বা রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বা সার্বভৌমত্বের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার কোনো কম্পিউটার সিস্টেম, নেটওয়ার্ক বা তথ্য পরিকাঠামোকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে। এর ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্নিষ্ট মহাপরিচালক এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো পরিবীক্ষণ ও পরিদর্শন করবেন এবং এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন সরকারের কাছে দাখিল করবেন।
যে ২৯ প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক এমনকি তিতাস গ্যাস কোম্পানিও রয়েছে।
সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, হ্যাকিংয়ের উদ্দেশ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ইমিগ্রেশন, পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দৈনিক ৭ হাজার বার সাইবার হামলা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সাইবার নিরাপত্তা বাড়াতে দেশের ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং সে জন্য দক্ষ জনবল বাড়াতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অজুহাতে সাধারণ মানুষ এমনকি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত বা সংকুচিত করা হবে কিনা?
'গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো' হিসেবে ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এখন কি সাংবাদিকরা চাইলেই প্রয়োজনীয় ও জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারবেন, নাকি এই ঘোষণার দোহাই দিয়ে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা তথ্য গোপন বিষয়ে আরও বেশি উৎসাহী হবেন?
যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা হচ্ছে এবং যে আইনটি মূলত ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের 'সম্মান সুরক্ষা'র কাজে ব্যবহূত হচ্ছে, সেই আইনের আলোকে যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে 'গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো' হিসেবে ঘোষণা করা হলো, তাতে তথ্য অধিকার আইনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবান্ধব আইন প্রশ্নের মুখে পড়বে কিনা?
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা অর্থ হলো, সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কম্পিউটার সিস্টেম ও নেটওয়ার্ক সুরক্ষিত রাখতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া। সুতরাং যে ২৯ প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা করা হলো, তা ওইসব প্রতিষ্ঠানের জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনত কোনো বাধা তৈরি না করলেও তথ্য গোপন করে অভ্যস্ত সরকারি কর্মকর্তারা এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে আরও বেশি কঠোর হবেন কিনা- সেটিই প্রশ্ন।
ধরা যাক বাংলাদেশ ব্যাংক। এখান থেকে যে কোনো তথ্য সংগ্রহ করা সাংবাদিকদের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন বলে সংশ্নিষ্ট প্রতিবেদক অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন। সব শেষ গত ২৮ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নির্দেশনা জারি করে। সেখানে বলা হয়, দুপুর ২টার আগে কোনো সাংবাদিক গভর্নর ভবনে প্রবেশ করতে পারবেন না। ১২ জুলাই আব্দুর রউফ তালুকদার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে যোগদানের দুই সপ্তাহ পরই এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কর্মসূচি বয়কটের কথাও ভাবছিলেন ব্যাংক বিটের সাংবাদিকরা। এর আগে ২০১৬ সালে ফজলে কবির নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর ওই বছরের ২৩ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন (বাংলা ট্রিবিউন, ২৮ জুলাই ২০২২)।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রবেশে কেন এই নিষেধাজ্ঞা? এখানে কী এমন হয়, যা কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের জানতে দিতে চায় না? অতএব, সদ্য ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতেও যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম রয়েছে; ফলে এ প্রতিষ্ঠান থেকে জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যে আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়বে, তা সহজেই অনুমেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি দপ্তরগুলোতে এক অদ্ভুত 'অনুমতি কালচার' তৈরি হয়েছে। তথ্য জানতে চাইলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দোহাই দেন। আবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দোহাই দেন মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তি, যেমন সচিবদের নাগাল পাওয়া কঠিন। অধিকাংশ সময় তাঁরা ফোনেও সাড়া দেন না। ব্যতিক্রম শুধু মন্ত্রীরা। তাঁরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে সমসাময়িক বিষয়ে নানা কথা বলেন। সেগুলোই খবরের শিরোনাম হয়। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বা বড় কোনো সংবাদের জন্য তাৎক্ষণিক যে মন্তব্য বা তথ্যের প্রয়োজন হয়, সেটি পাওয়া যায় না।
বস্তুত সংবাদমাধ্যম সঠিক তথ্য না জানলে বা প্রকাশ না করলে দেশের মানুষ অন্ধকারে থাকে। তখন গুজবের ডালপালা মেলে। যে কারণে বলা হয়, গুজব ঠেকানোর প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে সঠিক তথ্য। মনে রাখা দরকার, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, তত বেশি গুজবের ডালপালা মেলবে। একটি গোষ্ঠী মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য নানা ইস্যুতেই গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে। তখন মানুষ সংবাদমাধ্যমে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য না পেলে সোশ্যাল মিডিয়ার গুজবে বিশ্বাস করবে- যা আখেরে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল তো বটেই, দেশের জন্যও বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
সুতরাং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর দোহাই দিয়ে এই ২৯টি তো বটেই; রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা যাতে কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন বা হয়রানির শিকার না হন, সেটি সরকারের নিজের স্বার্থেই নিশ্চিত করা জরুরি।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক