ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আন্তর্জাতিক

পশ্চিমা বিশ্ব মোকাবিলায় ইরানের দৌড় কতদূর

পশ্চিমা বিশ্ব মোকাবিলায় ইরানের দৌড় কতদূর

ছবি-সংগৃহীত

স্কট লুকাস

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:০৫ | আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১৩:৪১

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যখন উদ্বেগ বেড়েই চলেছে, তখন বিশ্ববাসী সাম্প্রতিক জর্ডানে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বাইডেন প্রশাসনের জবাবের অপেক্ষা করছে। গত ২৮ জানুয়ারি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনী জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। এতে তিন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। জানামতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বেশ কয়েকটি পাল্টা হামলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনি এমন এক ব্যবস্থার কথা ভেবেছেন, যাতে এ অঞ্চলে উত্তেজনা আর না বাড়ে এবং মার্কিন অবস্থানেও যেন আর হামলা না হয়। অতীতে সিরিয়া ও ইরাক সীমান্তঘেঁষা জর্ডানের কাছে ‘টাওয়ার ২২’ ফাঁড়িতে বারবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদিও ইরান ড্রোন হামলার ঘটনাটি অস্বীকার করেছে। কিন্তু ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স নামে ইরাক-সমর্থিত শিয়াপন্থি সশস্ত্র বাহিনী এই হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করছে।  

এ ধরনের হামলায় ইরানের যে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা দেশটির জন্য জুয়া খেলার মতো। দেশটি দেখতে বেশ শক্ত মনে হলেও বাস্তবে দুর্বল। বিশেষত মার্চের ১ তারিখ নির্বাচন মাথায় রেখে সে দেশের মানুষের কথা বিবেচনায় রাখা জরুরি। দেশটি অর্থনৈতিকভাবে সমস্যাকবলিত। তা ছাড়া নারীদের প্রতি সরকারি আচরণের বিরুদ্ধে গণপ্রতিবাদও বেশ সাড়া জাগিয়েছে। বর্তমানে দেশটি ইসরায়েল, আইএস জিহাদি ও পাকিস্তানের মতো বিদেশি ঘটনাগুলোর চক্রে জড়িত হয়ে পড়েছে। মার্কিন হত্যার অনুমোদনের মধ্য দিয়ে দেশটি কেবল নিজেদের পরিস্থিতিই আরও জটিল করে তুলতে পারে।     

চাপের মধ্যে ইরান 

ক্রিসমাসের দিন ইসরায়েল দামেস্কের উত্তরাংশে ইরানের সামরিক প্রাঙ্গণে হামলা চালিয়েছিল। এতে সৈয়দ রেজা মৌসাভি নিহত হন, যিনি ছিলেন জেনারেল কাসেম সোলাইমানির ডান হাত। ২০২০ সালের জানুয়ারির দিকে কুদস বাহিনীর কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তহত্যার শিকার হন। সোলাইমানির চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী পালনের ৯ দিন পর ইরানের উত্তরাংশের কেন্দ্রস্থল কারমানে তাঁর কবরস্থানে আইএস দুটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। সোলাইমানি ছিলেন দেশটির জন্য একজন আইকনিক কমান্ডার, যিনি ইরাকে আইএসকে পরাজিত করেছিলেন। এর পরও আইএস তাঁর স্মৃতিসৌধ ধ্বংসের পাশাপাশি ৯১ জন লোক হত্যা করতে সক্ষম হয়। মনে হয়, ওই হামলা বন্ধে দেশটির কোনো শক্তিই ছিল না। 

ইরানের নেতা ও সেনাবাহিনী বিদেশে তাদের কর্মকর্তা কিংবা দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে অক্ষম ছিল বলে মনে হয়েছিল, তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’কে নেতৃত্ব দেওয়া তো দূরের কথা। তাদের শক্তি প্রদর্শনের দরকার হয়ে পড়েছিল। জানুয়ারির ১৫ তারিখ রেভল্যুশনারি গার্ডস ইরাকের কুর্দিস্তান থেকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কক্ষ উড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এ সময় তারা একজন কোটিপতি ব্যবসায়ীসহ তার পরিবারের সদস্য, অন্যান্য বেসামরিক ব্যক্তি ও এক বছরের কম বয়সী একজন ডাচ শিশুকে হত্যা করে। এর মাত্র ২৪ ঘণ্টা পরেই পাকিস্তানের বেলুচিস্তানকে নিশানা বানানো হলো। ইরানের সরকারি গণমাধ্যম ঘোষণা দিয়েছিল, বেলুচের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী জইশ উল-আদলের এক ক্যাম্পে গার্ডস ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে দলটি ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত ওই হামলায়ও দুটি শিশু নিহত হয়।      

তবে এসব প্রদর্শনমূলক ঘটনার ফল উল্টো হয়। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জবাব দিতে গিয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের আন্তঃসীমান্তে হামলা চালায়। পাকিস্তান দাবি করে, ‘সন্ত্রাসীদের’ হত্যা করা হয়েছে। তবে স্থানীয় গণমাধ্যমে বলা হয়, অন্তত তিনজন মহিলা ও চারজন শিশু মারা যায়। এদের সবাই ছিল ‘অ-ইরানি’। জানুয়ারির ২০ তারিখ ইরানের গোয়েন্দা কমান্ড সিরিয়ার দক্ষিণ দামেস্কে আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিষয়ে বৈঠক করে। তারা আলাপ শেষ করার আগেই ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র তিনতলা ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। এতে ইরানের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান, ডেপুটি ও রেভল্যুশনারি গার্ডের তিন সদস্য নিহত হন।  

সর্বোচ্চ নেতার যেসব চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক ভাষ্যকাররা মনে করেন, ইসরায়েলবাসী ও ফিলিস্তিনবাসীর মধ্যকার সংঘাতে ইরান খেলোয়াড় হিসেবে ভূমিকা রাখছে। প্রকাশ্যে তারা হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে দলগুলোর অভিযান থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। ইরানের জনসাধারণ হামাসের প্রতি সরকারি সমর্থনে খুব কমই উৎসাহ দেখিয়েছে। তা ছাড়া ৭ অক্টোবর থেকে বড় কোনো মিছিলও লক্ষ্য করা যায়নি। 

২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর সরকারের দমনপীড়নের ফলে ভোটারদের একটি বড় অংশ সরকারের কাছ থেকে দূরে চলে যায়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ‘নারী, জীবন ও স্বাধীনতা’র ওপর নিষ্ঠুর আগ্রাসনের প্রতিবাদে জনসাধারণ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। আসন্ন নির্বাচন মাথায় রেখে ক্ষমতার লাগাম কট্টরপন্থিদের হাতে নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক পরিষদ (গার্ডিয়ান কাউন্সিল) সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রোহানিসহ আরও হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়েছে। 

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, চলমান অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ইরানের অর্থনীতি অস্থিরতার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সরকারি হিসাবেই খাদ্য ও অন্যান্য দরকারি পণ্যের কারণে মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে। বাস্তবে তা এর চেয়েও বেশি। মজুরি ও কর্মক্ষেত্রের পরিস্থিতি নিয়ে জনঅসন্তোষ বেড়েই চলেছে। ২০২২ সালে তাদের মুদ্রা সর্বকালের সর্বনিম্নে অবস্থান করেছিল, যা গত মাসে ১০ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। 
‘গাজা কিংবা লেবানন নয়, আমার জীবন ইরানের জন্য’

ইরান বর্তমানে বড় বড় কথা বলেই টিকে আছে। একদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ দাবি করছে, আবার ইসরায়েলের গোয়েন্দা বাহিনীর নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে ইরাকের কুর্দিস্তানে আরও হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ঘোষণা দিয়েছিলেন, হামলার জবাব না দিয়ে ইসরায়েলকে ছেড়ে দেওয়া হবে না। তেহরান-সমর্থিত হুতিরা ইয়েমেনে লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা বিশ্ববাণিজ্যের ১২ শতাংশ জোগান দেয়। এদিকে হিজবুল্লাহ প্রতিদিন ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। 

কিন্তু ইরানের নেতৃত্ব এক অপকর্মের ফাঁদে পড়েছে। যদি তারা মিত্র গোষ্ঠীর ‘স্বাধীনতা’র ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরাসরি অভিযান থেকে নিজেকে বিরত রাখে, তাহলে সে অঞ্চলটিতে দন্তহীন বাঘ বলে পরিচিত হবে। যদি রেভল্যুশনারি গার্ডস আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের চেষ্টা করে, তাহলে পাল্টা প্রতিশোধের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি পরাজিতও হতে পারে। সেটা পাকিস্তান কিংবা ইসরায়েল থেকে আসতে পারে। সুতরাং সিরিয়া ও ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিছক ইরানের হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তাদের বলির পাঁঠাও বলা যেতে পারে। এসব গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইরানি নেতারা এমন বার্তা দিতে চাচ্ছেন– দেশটি এখনও কঠোর; যদিও ইরান কর্তৃপক্ষ সরকারিভাবে হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করছে।  

যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জবাব নিয়ে হিসাব কষছে। তবে চূড়ান্ত বাণী আসতে পারে ইরানবাসীদের কাছ থেকে, যাদের প্রধান উদ্বেগ দেশ নিয়ে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পরবর্তী গণবিক্ষোভের মধ্যেই তারা চিৎকার করে বলেছিল– ‘গাজা কিংবা লেবানন নয়, আমার জীবন ইরানের জন্য।’ খামেনি ও তাঁর অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী সেই বার্তা কবর দিতে গিয়েও অবশেষে জুয়া খেলতে পারে। 

স্কট লুকাস: আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন;
লেখাটি এশিয়া টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×