ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

নির্বাচনহীনতা বিদেশিদের সুযোগ করে দিচ্ছে

নির্বাচনহীনতা বিদেশিদের সুযোগ করে দিচ্ছে

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:০৭ | আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২০:১০

গত মাসে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বিশেষত বর্তমান বিশ্বের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়ে আসছে। অতি সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘ভারত, চীন আর রাশিয়া– তাদের সরকার হাসিনার সরকার।’ এর পর ঢাকাস্থ রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার মন্টিটস্কি বিএনপির ওই বক্তব্যকে প্রকাশ্যে ‘বিভ্রান্তিকর, মিথ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা নজিরবিহীন। বিষয়টি নিয়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্তন ও বর্তমান দুই অধ্যাপকের মন্তব্য জানতে চেয়েছিলাম। তাদের বক্তব্য নিচে দেওয়া হলো। 

বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা যেভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলছেন, তাতে আমাদের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ চীন, রাশিয়া ও ভারত যেভাবে হস্তক্ষেপ করল; যেভাবে তারা নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করল, তাতে স্পষ্ট– রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের যে আত্মমর্যাদাবোধ থাকার কথা, সেটা না থাকার কারণে আমরা এ রকম একটা অবস্থার শিকার হলাম।

এর মধ্য দিয়ে আমাদের ঝুঁকি ও বিপদগুলো স্পষ্ট হচ্ছে। যেমন নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে কারা ভূমিকা পালন করছে; আমরা শেষ পর্যন্ত আমাদের সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীনভাবে নিতে পারছি কিনা– এ প্রশ্ন চলে আসে। আমরা তো দেখলাম, নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, রাশিয়া– চারটি দেশেরই ভূমিকা কী। এসবের ফলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটা কোনোভাবে কাম্য নয়।

বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি তৈরির কারণ স্পষ্ট। দেশে যারা ক্ষমতায় আসতে চায়, তাদের রাজনৈতিকভাবে মানুষকে সংগঠিত করার শক্তি নেই। তাই তারা নিজের দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা না করে পছন্দমতো বিদেশিদের পক্ষে-বিপক্ষে বলছে। ঠিক একইভাবে যারা ক্ষমতায় আছে, তাদের যেহেতু গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের ভীতি কিংবা শঙ্কা আছে, তারাও জনগণের চেয়ে পছন্দের বিদেশি শক্তিকেই গুরুত্ব দেয়। ফলে উভয়েরই কিন্তু বিদেশনির্ভরতা বেড়েছে। 

এদিকে আমরা জানি, দক্ষিণ এশিয়ায়  ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিকের মাধ্যমে এ অঞ্চল ঘিরে ক্ষমতাধর দেশগুলোর রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ পাল্টাচ্ছে। আর বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ওই বিদেশিদের হিসাবনিকাশ সহজ করতে একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতায় আসা কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের যে বিদেশনির্ভরতা বেড়েছে, সেই নির্ভরতাকে কাজে লাগিয়ে বিদেশিরা এ অঞ্চলে তাদের জাতীয় স্বার্থকে নিশ্চিত করতে চায়। সেটা ইন্দো-প্যাসিফিক হোক কিংবা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভ। প্রতিবেশী মিয়ানমারের দিকে তাকালেও আমরা বিষয়টা বুঝতে পারি। সেই দিক থেকে আমাদের এখানে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের যে অনুপস্থিতি, তার ফলে পরিস্থিতি বিদেশিদের অনুকূলে চলে গেছে। একই সঙ্গে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে সক্ষমতা বা স্বাধীনতা, তা খর্ব হয়েছে। 

আমাদের স্বাভাবিক যে রাজনৈতিক চর্চা এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষের যে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। সেটা করতে পারলে, যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক বা যারাই আসতে চাক না কেন, তাদের জন্য বিদেশি শক্তির সঙ্গে একটা দরকষাকষির জায়গা তৈরি হয়। এখন এই দরকষাকষির জায়গাটা না থাকার কারণে ওরা ওদের মতো করে হস্তক্ষেপ করছে, যেটা আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে নয়। 

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বাংলাদেশের রাজনীতি বা নির্বাচন নিয়ে যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছে, এটা নিছক কথা চালাচালিতে সীমাবদ্ধ নেই। আমরা দেখেছি, নির্বাচনের আগে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ আমাদের বন্দরে এসেছে। নির্বাচন বিষয়ে ৯০টি দেশের কূটনীতিকের সঙ্গে আমাদের আলোচনা করতে হয়েছে ভারতে গিয়ে। একইভাবে নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দ যেভাবে চীন, ভারত ও রাশিয়াকে নিয়ে বক্তব্য দিলেন, তাতেই নিশ্চিত হয়ে গেছে– বিষয়টি কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিএনপি নেতার রাশিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া বক্তব্যকেও এ প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন যে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, সেই স্বার্থকে কেন্দ্র করে নতুন যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা; বিশেষ করে মিয়ানমারকে যদি আমরা বিবেচনা করি এবং সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করি, তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশ তাদের জন্য একটা প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য খুবই বিপজ্জনক।

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×