কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা-ডিপিইও অতি উৎসাহী হইয়া যেভাবে প্রাথমিক শিক্ষকগণের 'মান যাচাই'করণে পরীক্ষার আয়োজন করিয়াছেন, তাহা 'উদ্ভাবনীমূলক' হইলেও এখতিয়ারভুক্ত নহে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাইতেছে- জেলার অন্তত ১৩ সহস্র শিক্ষকের জন্য এই আয়োজন তিনি করিয়াছেন নিতান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে। এই ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তরের অনুমতির প্রয়োজনীয়তা খুঁজিয়া পাওয়া যায়নি। আর ডিপিইও জেলা প্রাথমিক শিক্ষার উচ্চতম কর্মকর্তা বিধায় নিরীহ শিক্ষকগণও ইহার প্রতিবাদ করিতে সাহসী হইতেছেন না। আমাদের প্রশ্ন- তিনি কি জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমকে জমিদারি ঠাওরাইয়াছেন? তাঁহাকে অতি অবশ্যই মগজে লইতে হইবে- প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় তিনি জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা হইলেও সর্বেসর্বা নহেন। রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও নজরদারির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মাত্র। সমগ্র দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি ইউনিট হিসাবে পরিচালিত হয় বিধায় অভিন্ন নিয়মেও চালাইতে হয়। এইখানে শিক্ষকদের পদোন্নতির বিধানও অভিন্ন। এককভাবে কোনো ডিপিইও চাহিলেও পরীক্ষা লইয়া শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াইতে পারেন না। অধিকন্তু পরীক্ষা আয়োজনের প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থানই বা হইবে কোথা হইতে? পরীক্ষায় 'উত্তীর্ণ' সংক্রান্ত অবৈধ অর্থ লেনদেনের ঝুঁকিও কি নাই?
আপাতত জরুরি প্রশ্ন হইল, কুমিল্লার ডিপিইওর অকস্মাৎ শিক্ষকদের মান যাচাই করিবার আবশ্যকতা কেন? উক্ত জেলায় ১৩ সহস্র শিক্ষকের অনেকেই চাকুরির শেষ বয়সে উপনীত। আবার অনেকেরই সিইনএড বা ডিপিএড সনদ হস্তগত। গড়পড়তা সকল শিক্ষকের জন্য এহেন পরীক্ষার আয়োজন হেতু তন্মধ্যে জ্যেষ্ঠগণ স্বাভাবিকভাবেই মর্মাহত। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদ্যবিদায়ী সিনিয়র সচিব শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করিবার জন্য স্ব স্ব বিষয় উত্তমরূপে অধ্যয়নের সাম্প্রতিক অনুরোধকে উপলক্ষ করিয়া কুমিল্লার ডিপিইও সবল শিক্ষকের জন্য পরীক্ষার আয়োজন করিতেছেন বলিয়া অনেকেই সহমত। সচিবের কথা যুক্তিসংগত- নিঃসন্দেহে। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক যে সকল বিষয়ে পাঠদান করিবেন; তাহাতে সম্যক ধারণা আবশ্যক। তিনি যখন শিশুদের পড়াইতে যাইবেন, পূর্বেই তৎসংশ্নিষ্ট প্রস্তুতি অবশ্যই গ্রহণ করিবেন। বস্তুত সচিবের বক্তব্যের মর্মবাণী এতদ্রূপ। এইখানে শিক্ষকদের সামষ্টিক পরীক্ষা অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হইল তাঁহার ব্যক্তিগত অধ্যয়ন ও প্রচেষ্টা। ডিপিইও সেখানেই জোর দিতে পারিতেন। তিনি তাহা না করিয়া পরীক্ষা গ্রহণের ন্যায় যে তুঘলুকি কাণ্ড ঘটাইতে যাইতেছেন, তাহা এখতিয়ার-বহির্ভূত বাড়াবাড়ি বৈ কিছু নহে।
পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষকদের মান যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবার ক্ষেত্রে কুমিল্লার ডিপিইওর উদ্দেশ্য মহৎ থাকিলেও তাহা স্পষ্টত অসংবেদনশীল ও অতিসক্রিয়তা দোষে দুষ্ট। ইহার পরিবর্তে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিংবা শিক্ষকদের বিভিন্ন আয়োজনে পরামর্শ দিতে পারেন। শিক্ষকরা কীভাবে শ্রেণি কার্যক্রম চালাইতেছেন, সরেজমিন দৃষ্টি দিতে পারেন। বস্তুত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনাও এমনই। সেই পর্যবেক্ষণের আলোকে সংশ্নিষ্ট শিক্ষককে পরামর্শ দিলে তাহা শিক্ষকের জন্যও উপকারী হইত। তাহা না করিয়া ডিপিইও হাঁটিতেছেন উল্টা পথে; যাহার বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ তিনি যেরূপ উৎসাহে পরীক্ষাবিষয়ক মত সমকাল প্রতিবেদকের নিকট ব্যক্ত করিয়াছেন, তাহাতে ইহা মানিয়া লওয়া অসংগত হইবে না, তিনি বিষয়টিকে তাঁর কৃতিত্ব বলিয়া ভাবিতেছেন। কুমিল্লার ডিপিইও যে ঢাকঢোল পিটাইয়া পরীক্ষাটি গ্রহণ করিতেছেন, তাহার ফল যদি সেইভাবে প্রকাশ করিয়া থাকেন; অনেক শিক্ষকের জন্যই হইবে বিব্রতকর। আর বিদ্যালয়ের কর্মদিবসে সকল শিক্ষক পরীক্ষায় বসিলে শ্রেণি কার্যক্রম চালাইবেন কাহারা? উক্ত জেলা কর্মকর্তার সেই কাণ্ডজ্ঞানেরও অভাব রহিয়াছে।
কুমিল্লার ডিপিইও তাঁহার খেয়ালখুশিমতো দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করিতে পারেন না। শিক্ষকদের যাচাই করার নামে এই বাড়াবাড়ি অবিলম্বে বন্ধ করা হউক। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অনুমতি না লইয়া এ আয়োজনে এতদূর পথ হাঁটিবার পরও কেন অধিদপ্তর জানিতে পারিল না- সেই দায় এড়াইবার অবকাশ নাই। তবে সর্বাগ্রে আলোচ্য কর্মকর্তাকে জবাবদিহি করা হউক। নিয়মিত দায়িত্ব পালনেই যেখানে প্রাথমিক শিক্ষার উপজেলা কিংবা জেলা প্রশাসনের গাফিলতি স্পষ্ট এবং তজ্জন্য এ পর্যায়ের শিক্ষায় নানা সংকটের উদ্ভব হইয়াছে, সেইখানে এই অতিরিক্ত পরীক্ষা আয়োজনের কোনো যৌক্তিকতা নাই।