মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্কটা ছিল দ্বন্দ্ব-মধুর। তাতে মাধুর্য ছিল স্নেহ-ভালোবাসার। আবার দ্বন্দ্বও ছিল দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানগত কারণে। উভয়েই ছিলেন গভীরভাবে বাঙালি। বাঙালির মুক্তির জন্য তাঁদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, তৎপরতা ছিল অদম্য। আবার তাঁরা এসেছেনও একই শ্রেণি থেকে। একই সঙ্গে সংগঠন করেছেন, কারাভোগ করেছেন; সময় কাটিয়েছেন।
আগরতলা মামলায় বন্দি অবস্থায় থেকে মওলানা ভাসানীকে শেখ মুজিব যে চিরকুট পাঠিয়েছিলেন, তাতে তপ্ত এক বারুদের স্তূপে আগুন ধরেছিল। মওলানা জ্বলে উঠেছিলেন। হাজার হাজার মানুষের জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন- মুজিবকে মুক্তি না দিলে জনগণকে নিয়ে তিনি ক্যান্টনমেন্ট থেকে তাঁকে মুক্ত করে আনবেন; ফরাসি বিপ্লবের মতো ঘটনা ঘটে যাবে। বিক্ষোভ ও ঘটনা নানা দিক থেকেই ঘটছিল। কিন্তু ভাসানীর অবস্থানই ছিল নির্ধারক। শেখ মুজিব মুক্তি পেয়েছিলেন; আগরতলা মামলা প্রত্যাহূত হয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য সেটি ছিল প্রথম বড় পরাজয়; একাত্তরে চূড়ান্ত পরাজয়ের আগে।
শুরুতে ভাসানী-মুজিবের চলাটা ছিল একই পথে; আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে। হাজী দানেশ জানাচ্ছেন, ১৯৫০ সালে ঢাকা জেলে বসে মুজিবের সঙ্গে ভাসানী সশস্ত্র সংগ্রামের কথা আলাপ করতেন। কিন্তু ভাসানী তো শুধু স্বাধীনতার কথা ভাবেননি; ভেবেছেন মুক্তির কথাও। 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম'- এ কথা শেখ মুজিবও বলেছেন, ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতায়। কিন্তু দু'জনের সামনে মুক্তির পথ মোটেই অভিন্ন ছিল না।
ভাসানীর জন্য মুক্তির পথটা ছিল সামাজিক বিপ্লবের; মুজিবের জন্য সংসদীয় গণতন্ত্রের। পার্থক্যটা একেবারেই মৌলিক। বলা যায়, রাজনীতির দুই ধারার। দৃষ্টিভঙ্গির এই ব্যবধান ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছিল; চূড়ান্ত হয় ন্যাপ গঠনের সময়ে। ১৯৬৯-এ গোলটেবিল বৈঠকে ব্যর্থ হয়ে ঢাকায় ফিরে শেখ মুজিব বলেছিলেন- ভাসানীর বয়স হয়েছে; তাঁর রিটায়ার করা উচিত। এমন কথা কি তিনি সোহরাওয়ার্দীকে কখনও বলতে পারতেন? বোধ হয় না। কারণ ওটি শুধু বিরক্তির কথা ছিল না; ছিল রণনীতির ভিন্নতার কথাও। যে ভিন্নতা সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা দেয়নি। প্রয়োজনের চাপে বাধ্য হয়ে সোহরাওয়ার্দীকে তিনি বড়জোর বলতে পারতেন- আমি দুঃখিত, আমাকে লড়তে হবে স্বাধীনতার জন্য; পাকিস্তানকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনার থাকুক, এখন যেমন আছে।
মিল তো অবশ্যই ছিল দু'জনের- ভাসানী ও মুজিবের। তাঁরা উভয়েই ছিলেন সার্বক্ষণিক রাজনীতিক। প্রজ্ঞা ও সাহস উভয়ের জন্যই ছিল বড় সম্পদ। তাঁরা কেউই বৈঠকখানার রাজনীতি করতেন না; আবার গোপন রাজনীতিও নয়। তাঁরা মাঠে-ময়দানে ছিলেন; অনায়াসে চলে গেছেন কারাগারে। বের হয়ে আবার শামিল হতেন একই কাজে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সুবিধাবাদী মুসলিম লীগ থেকে বিতাড়িত ও দলছুটদের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠনে দু'জনেরই ছিল প্রবল আপত্তি; যদিও পরিস্থিতির চাপে তাঁদের পক্ষে বিরোধিতার অনড় অবস্থানে থাকা সম্ভব হয়নি। সাংগঠনিক ক্ষমতা দু'জনেরই ছিল অসামান্য। ব্যক্তিত্বেও তাঁরা অসাধারণ। কিন্তু চিন্তাধারার ঐক্য ছিল না।


আন্তর্জাতিক বিষয়ে শেখ মুজিব তেমন একটা মাথা ঘামাতেন না বলে সোহরাওয়ার্দী উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তৎপরতা বিষয়ে তিনি যে অমনোযোগী ছিলেন- তা মোটেই নয়। 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে তিনি লিখেছেন, ১৯৫৪ সালে 'পাকিস্তান-আমেরিকান মিলিটারি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরে পাকিস্তান সিয়াটো ও সেন্টো বা বাগদাদ চুক্তিতে যোগদান করে পুরোপুরি আমেরিকার হাতের মুঠোর মধ্যে চলে যায় [...] চুক্তির মধ্যে যা আছে তা পরিস্কারভাবে কমিউনিস্টবিরোধী বলা যেতে পারে।' বোঝা যাচ্ছে, ওই পর্যায়ে তিনি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নীতি চাচ্ছিলেন, যেটি আওয়ামী লীগেরও দাবি ছিল। তিনি আরও স্মরণ করেছেন, ১৯৫৪-তে 'গ্রেফতারের পূর্বেই পাক-আমেরিকান মিলিটারি প্যাক্টের বিরুদ্ধে এক যুক্ত বিবৃতি দিই।' ওই সময়ে তিনি ভাসানীপন্থিই ছিলেন; সোহরাওয়ার্দীপন্থি হয়েছেন পরে।
১৯৫৪-তে ভাসানীর পাল্লাটা অনেক ভারী ছিল। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচিত ২২২ জন সদস্যের মধ্যে ১৬৮ জনই সামরিক চুক্তিবিরোধী ওই বিবৃতিতে দস্তখত দেন। ১৯৫৭-তে এসে ভারসাম্যটা উল্টে যায়, যে জন্য ন্যাপ গঠিত হয়। বলা বাহুল্য, এই পরিবর্তনে শেখ মুজিবের সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রত্যক্ষ। ওই সময়ে এমন সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়- যুবলীগের নেতারা, অর্থাৎ কমিউনিস্টরা আওয়ামী লীগের ভেতরে থেকে আর কাজ করতে পারবেন না। এতে শেখ মুজিবের সম্মতি ছিল।
শেখ মুজিব যে সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতির দিকেই ঝুঁকবেন- এটি ছিল অবধারিত। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, কারাবন্দি অবস্থায় তিনি খবরের কাগজে পড়েছেন যে আতাউর রহমান খান জুরিখ যাচ্ছেন সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করতে এবং সেখান থেকে বিলাত যাবেন ভাসানীর কাছে। খবরটা তাঁকে চিন্তিত করেছিল। তাঁর সন্দেহ হয়েছিল, কোনো ষড়যন্ত্র চলছে। পরে যখন শুনলেন, সোহরাওয়ার্দী আইনমন্ত্রী হয়েছেন, তখন তিনি খুবই কষ্ট পেয়েছেন এবং তাঁর মধ্যে একটি হতাশার ভাবও জেগে উঠেছিল। অসমাপ্ত আত্মজীবনী ১৯৫৫-তে এসে শেষ হয়েছে। ফলে পরবর্তী ঘটনার কথা তাতে আসেনি। কিন্তু পরবর্তী ঘটনা তো এটিই যে, আওয়ামী লীগ ভাঙল এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিত্ব শুধু মেনেই নিতে হলো না; তাঁর সঙ্গেই থাকতে হলো। সেটিই করতে হতো। কারণ ভাসানীর পথটা তো উল্টো দিকের।
সোহরাওয়ার্দী লক্ষ্য করেছেন, শেখ মুজিব পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না, তা ঠিক। কিন্তু তিনি তাঁর লিডার সোহরাওয়ার্দীর এই বক্তব্য অবশ্যই মানতেন- রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং এই দ্বন্দ্বে শক্তি সংগ্রহ করতে হলে আমেরিকার শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় নেই। অন্যদিকে ভাসানী বিশ্বাস করতেন আন্তর্জাতিকতায়। সারাবিশ্বের উৎপীড়িত মানুষের মুক্তিসংগ্রাম তাঁকে আকর্ষণ করত এবং পূর্ববঙ্গের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের যে ঔপনিবেশিক শাসন; সেটি যে সাম্রাজ্যবাদের, বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই ঘটছে- এ জিনিসটা তাঁর কাছে মোটেই অপরিস্কার ছিল না। তাই তিনি ছিলেন যাকে বলে কট্টর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, সেটাই।
ওদিকে আমেরিকাকেও তখন চারদিকে মিত্র খুঁজতে হচ্ছে, বিশেষ করে কমিউনিজমের ভীতিতে। পাকিস্তানকে সেন্টো-সিয়াটোতে টেনে নেওয়ার কারণ কমিউনিস্টদের রোখার চিন্তা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। পূর্ববঙ্গে যে জাতীয়তাবাদী বিক্ষোভ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে, সে বিষয়ে তারা পুরোপুরি ওয়াকিবহালএবং তাদের উদ্বেগ ছিল- এ আন্দোলন পাছে কমিউনিস্টদের হাতে চলে যায়; ভিয়েতনামে যেমনটা ঘটেছে। ন্যাপের অভ্যুদয় দেখে তাদের উদ্বেগ বাড়ারই কথা। তাদের সমর্থন তাই আওয়ামী লীগের দিকে থাকবে- এটি আশা করা অসংগত ছিল না। কিন্তু ততদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে ভাসানী ও মুজিবের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। স্বাধীনতা অর্জনের পথ নিয়ে মতভিন্নতা থাকতে পারে; গন্তব্য নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো দ্বিমত ছিল না।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়