ইসলাম শান্তি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বিধান মেনে চলার মধ্যেই রয়েছে মানবজীবনের সামগ্রিক কল্যাণ। পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ মানবজীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। তাই মানবতার মুক্তির দূত মহানবী (সা.) পরস্পর দেখা-সাক্ষাতের সময় আসসালামু আলাইকুম বলে অভিবাদন জানাতে নির্দেশ দেন (আবু দাউদ)।
আসসালামু আলাইকুম অর্থ- আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। পরিভাষায়, এক মুসলিম আরেক মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় যে বাক্য দ্বারা পারস্পরিক ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, শান্তি, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও দোয়া কামনা করেন, তার নামই সালাম। কোনো মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে কথা বলার আগে সালাম দেওয়া প্রিয় নবীর (সা.) সুন্নাত। আর সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব।
সালাম শব্দটি মহান আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। মহান আল্লাহ সালামের গুরুত্ব বর্ণনা করে মহাগ্রন্থ আল কোরআনের সুরা আন-নিসার ৮৬ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন, সালাম প্রদানকারী সালামের মাধ্যমে যেরূপ শব্দ ব্যবহার করবে তার চেয়ে উত্তমরূপে তুমি জবাব দেবে অথবা অনুরূপ শব্দই বলবে। সুতরাং এর দ্বারা বোঝা গেল, কোনো ব্যক্তি সালাম দিলে তাঁর জবাব দেওয়া ওয়াজিব। এর সঙ্গে রহমত, বরকত ইত্যাদি শব্দ বলে উত্তর দেওয়া মুস্তাহাব। আবু দাউদ ও তিরমিজি শরিফে বর্ণিত- রাসুলে কারিম (সা.)-এর দরবারে এক সাহাবি এসে 'আসসালামু আলাইকুম' বলে বসে পড়লেন। রাসুলে কারিম (সা.) তাঁর উত্তর দিয়ে বললেন, সে ১০টি নেকি পেয়েছে। এর পর আরেক সাহাবি এসে 'আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ' বলে বসে গেলেন। রাসুলে কারিম (সা.) তাঁর উত্তর দিয়ে বললেন, সে ২০টি নেকি পেয়েছে। অতঃপর আরেকজন এসে 'আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু' পর্যন্ত বলে বসে পড়লেন। রাসুলে কারিম (সা.) তাঁর উত্তর দিয়ে বললেন, সে ৩০টি নেকি পেয়েছে। হজরত মায়াজ ইবনে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, চতুর্থ এক ব্যক্তি এসে ওয়া বারাকাতুহুর শেষে 'ওয়া মাগফিরাতুহু' বলে বসে গেলেন। রাসুলে পাক (সা.) তাঁর উত্তর দিয়ে বলেন, সে ৪০টি নেকি পেয়েছে।
সালামের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, যখন দুই মুসলমানের মধ্যে সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁরা সালাম-মুসাফাহা করে, তখন একে অপর থেকে পৃথক হওয়ার আগেই তাঁদের সব (ছোট) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। সালামের মাধ্যমে পরস্পর দয়া-মায়া, আন্তরিকতা, ভালোবাসা, মমত্ববোধ, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার ভাব বৃদ্ধি পায়। আর এসব গুণ যখন একজন মানুষের অন্তরে জাগ্রত হয়, তখন মানব মনে লুকিয়ে থাকা অহংকার, বড়ত্ব, হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ ইত্যাদি অনৈসলামিক ও দূষণীয় চিন্তাধারা দূরীভূত, ইমান মজবুত ও অন্তর নরম হয়।
রাসুল (সা.) সালাম বিনিময়ের যে সংস্কৃতি চালু করেছিলেন, তা আজ অনেকটাই বিকৃত হয়ে গেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর কতিপয় নমুনা হচ্ছে- অফিসের বড় সাহেব তাঁর পিয়নকে বললেন, আফজাল সাহেবকে আমার সালাম দাও। এ সালামের মানে হলো, আফজাল সাহেব যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। ব্যবসায়ী তাঁর এক কর্মচারীকে দিয়ে অন্যজনের কাছে সালাম পাঠান। ব্যবসায়ী এ সালাম পাঠান বকেয়া পাওনা আদায়ের জন্য। ঈদের দিন শিশু-কিশোররা আত্মীয়স্বজনের বাসায় গিয়ে মুরুব্বিদের সালাম দেয় কিছু পাওয়ার জন্য। আসলে তারা এ দিনে সালাম দিয়ে সালামি বা টাকা কুড়াতে আসে; মূল উদ্দেশ্য সালাম দিতে আসা নয়। অফিসে এসে বড় সাহেবকে সালাম দেওয়ার অভ্যাস আছে অনেকের। কোনো না কোনো উসিলায় তাঁরা দেখা করবেনই এবং একটা সালাম দেবেনই। এখানে বড় সাহেবকে সালাম দেওয়া মানে বড় সাহেবের নজরে আসা এবং বাড়তি সুবিধা আদায়ের প্রত্যাশা। সালামের অপব্যবহার ও বিকৃত উচ্চারণ থেকে বিরত থাকা এবং সঠিক নিয়মে সালামের ব্যাপক প্রচলন দরকার।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা