গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হলে এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য মুনাফা কমানোর এ সিদ্ধান্ত বাড়তি চাপ তৈরি করবে কিনা- সে প্রশ্ন ওঠে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বৈঠকে সঞ্চয়পত্রের নানা দিক জানতে চায় এবং এ বিষয়ে তাদের অভিমত জানিয়ে বলে- আইএমএফ চায় সঞ্চয়পত্রের সুদের হার আরও কমিয়ে আনুক বাংলাদেশ এবং এ হার অন্তত বাজারদরের কাছাকাছি থাকুক। ব্যয় কমানো ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি (সমকাল, ১ নভেম্বর ২০২২)।
প্রসঙ্গত, অর্থনীতির দুরবস্থা কাটাতে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। এ অবস্থায় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় আসে সংস্থাটির প্রতিনিধি দল। তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বৈঠকে যেসব বিষয়ে পরামর্শ (ঋণ পাওয়ার শর্ত) দিয়েছে, সেখানে সঞ্চয়পত্রে মুনাফা তথা সরকারের ভর্তুকি কমানোর বিষয়টিও রয়েছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, বেশ কিছু খাতে সরকারের ভর্তুকি নিয়ে প্রশ্ন আছে, বিশেষ করে যেসব ভর্তুকি সাধারণ মানুষের কোনো কাজে লাগে না। যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান গুনছে, অথচ যাদের লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা, যেমন- বাংলাদেশ বিমান, রেল, রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন করপোরেশন। যেগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে লোকসান নয়, বরং লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, সেসব প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ভর্তুকি দিতে হবে কেন- তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ তো বটেই, সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন আছে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা লোকসান দেখিয়ে জনগণের পয়সা লুটপাট করেন। লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলে ভর্তুকি বন্ধ হয়ে যাবে; তখন জবাবদিহি বাড়বে বলে ইচ্ছা করেই সেগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে দেন না- এই নির্মম সত্যও এখন আর গোপন নয়। সুতরাং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ভর্তুকি বন্ধ করে সেগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া কিংবা লাভজনক করার জন্য পদ্ধতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
অন্যদিকে এখনও দেশের অধিকাংশ কৃষক আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নন এবং কৃষির উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষকে অনেক বেশি দামে কৃষিপণ্য কিনতে হয়। সুতরাং এ খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতেই হবে। বীজ, সার ও ডিজেলে ভর্তুকি লাগবে। সংকটকালে কৃষকের জন্য প্রণোদনাও লাগবে। সেই সঙ্গে দেশ যতদিন পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত না হবে; দেশে দারিদ্র্য থাকবে; সর্বজনীন পেনশন চালু করা না যাচ্ছে এবং বিরাট জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকবে, ততদিন পর্যন্ত বয়স্ক ও বিধবা ভাতার মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে।
যেহেতু অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত বিশেষ করে যাদের বিকল্প আয়ের সুযোগ নেই, তাদের বিরাট অংশ সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের কথা বিবেচনায় রেখে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানো উচিত হবে না। আইএমএফের ঋণ পাওয়ার জন্য এ ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ধনী লোকের পেটে চলে যাওয়া ঠেকাতে এ খাতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো দরকার। কারণ বিপুল অঙ্কের অবৈধ ও অসৎ পথে উপার্জিত টাকাও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হয়। সরকার এসব অসৎ ও দুর্নীতিবাজের জন্য কেন মুনাফা দেবে? যাঁরা ভালো চাকরি করেন; যাঁদের ব্যবসা আছে; উপার্জনের একাধিক পথ খোলা; রাষ্ট্র কেন তাঁদের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে আরও বেশি আয়ের সুযোগ দেবে- সেটিও যৌক্তিক প্রশ্ন। কিন্তু তাঁদের কারণে প্রকৃতপক্ষেই যাঁরা সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা কেন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন?
সুতরাং কারা সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং এ ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বৈধ পথে কিছু টাকা সঞ্চয় করে একটা সময় সেই টাকা কোথাও রেখে মাসে মাসে একটা নির্দিষ্ট আয়ের ব্যবস্থা করতে চান। সেসব মানুষকেও সঞ্চয়পত্রের সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু সচ্ছল ও ধনী লোক যাতে সঞ্চয়পত্র কিনতে না পারেন, সেব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিও নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার, যেটি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং নিঃসন্দেহে তা দেশের এক নম্বর সমস্যা। দুর্নীতি কমানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে ভর্তুকির পরিমাণও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা যাবে। বরং দুর্নীতি কমানোয় আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কী ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু ভর্তুকি কমানোর নামে সাধারণ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। মূল্যস্ম্ফীতির চাপে এমনিতেই সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। সেখানে আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানের ঋণ পাওয়ার শর্ত মানতে গিয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না, যা সরাসরি ওই স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন আরও কঠিন করে তুলবে। কেননা, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মানুষের জীবন যে কত কঠিন হয়েছে, তা সঞ্চয়পত্র-সম্পর্কিত একটি সংবাদেই স্পষ্ট। ৩১ অক্টোবর সমকালের একটি খবরের শিরোনাম :'সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানো হচ্ছে বেশি'। যেখানে বলা হয়, সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যে পরিমাণ টাকা আসছে, মানুষ ভাঙিয়ে ফেলছে তার চেয়ে বেশি। বিশেষ করে ডাকঘর সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতা অনেক বেড়েছে। এতে গত সেপ্টেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্রে সরকারের নিট বিক্রি ৭১ কোটি টাকা কম। এর মানে বিক্রির তুলনায় সঞ্চয়পত্র ভাঙানো হয়েছে বেশি। বেশিরভাগ জিনিসের দাম বাড়ার ফলে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে অনেকে এখন সঞ্চয় তুলে নিচ্ছেন বলেও খবরে উল্লেখ করা হয়। সুতরাং সঞ্চয়পত্রে ভর্তুকি কমানো নয়, বরং এখানে নজরদারি বাড়াতে হবে।
আমীন আল রশীদ :সাংবাদিক ও লেখক