ইতিহাস, শ্রেণি ও সংস্কৃতির কথা এখন আমরা যত বলি ও শুনি, তত বোধ হয় আগে কখনও বলিনি; শুনিওনি। কেবল যে প্রচলন বেড়েছে, তা নয়; এই ধারণা তিনটির ধারণাতেও পরিবর্তন এসেছে। তিনটি বিষয়ই মানুষের স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
স্বাধীনতার প্রশ্নটিও অত্যন্ত আবশ্যক ও অতিশয় পুরোনো। রুশো বলেছিলেন, আমরা জন্মি স্বাধীন হয়ে; জন্মে দেখি পরাধীন। কথাটা সত্য বটে। মানুষ স্বাধীনতা আশা করেছে, কিন্তু বারবার প্রতিহত হয়েছে। প্রকৃতি ও অদৃষ্ট তাকে আবদ্ধ করেছে বলে মনে করা হয়েছে। ইউরোপীয় রেনেসাঁন্সের সময় নতুন জ্ঞান লাভ ঘটেছে যে, বাইরের প্রকৃতি নয়, অমোঘ অদৃষ্টও নয়; মানুষ সীমাবদ্ধ নিজেরই অন্তর্গত চরিত্র দ্বারা। পরে, অনেক পরে ফ্রয়েড এসেছেন। বলেছেন, চরিত্র নয়; প্রবৃত্তিই নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে। এ-কালে আমরা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বিশেষভাবে সজাগ। রুশোও সেই অধীনতার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন- বিশেষভাবে। 
প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি? রাষ্ট্র তো শ্রেণি-কর্তৃত্ব বজায় রাখার বিশেষ আয়োজন মাত্র। শ্রেণি শাসন করবে শ্রেণিকে। অল্প মানুষ অনেক মানুষের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখা- রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপত্র এটাই। শাসন মানে শোষণই; অন্য কিছু নয়। এ জন্যই স্বাধীনতার সঙ্গে শ্রেণির সম্পর্ক এমন প্রত্যক্ষ, এত বেশি ওতপ্রোত।
শ্রেণি আগেও ছিল, কিন্তু শ্রেণি সম্পর্কে এমন সচেতনতা আগে ছিল না। মার্কস (ও এঙ্গেলস) দেখিয়েছেন, মানুষের অগ্রগতির ইতিহাস শ্রেণি-সংগ্রামের ইতিহাস। মার্কস শ্রেণি আবিস্কার করেননি। শ্রেণি তার আগেও ছিল। মার্কস যা উদ্ঘাটন করলেন তা হলো এই সত্য যে, শ্রেণির ভেতরটা হচ্ছে অর্থনৈতিক এবং শ্রেণি যে কেবল নিজে নিজে আছে, তা নয়। আত্মসচেতনভাবেই সে অবস্থান করছে ও নিজের স্বার্থে নিরাপোসরূপে পাহারা দিচ্ছে। এর সঙ্গে শ্রেণিতে শ্রেণিতে দ্বন্দ্ব চলছে এবং সেই দ্বন্দ্বেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মানুষের ইতিহাস।
অসাধারণ মানুষ যাঁরা- শিল্পী ও দার্শনিক; তাঁরা অবশ্যই যান্ত্রিক পুতুল নন এই শ্রেণি-ব্যবস্থার হাতে। শ্রেণির মানুষ হয়ে এমনকি প্রতিনিধিত্ব বিসর্জন না-দিয়েও তাঁরা উন্মোচিত করতে পারেন শ্রেণি চরিত্রকে; করেনও। অগ্রবর্তী চিন্তার পদধ্বনি তাঁদের কল্পনা ও চিন্তায় বেজে উঠতে পারে বৈকি, ওঠেও। পারেন তাঁর অনাগতকে দেখতে; দেখেনও। তবু এটাই স্বাভাবিক যে, তাঁদের চিন্তা ও কল্পনায় শ্রেণি কোনো না-কোনোভাবে থাকবেই।
এই যে শ্রেণি, এ বিশেষ স্থান ও কালে অবস্থান করে। স্থান ও কাল বলার চেয়ে ইতিহাস বলা অধিকতর সংগত। আর ইতিহাস বলতে কেবল স্থান ও কালই বোঝায় না। বোঝায় বিশেষ বিশেষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও। আরও সুস্পষ্ট অর্থে উৎপাদন পদ্ধতিকেও। ইতিহাসের বাইরে কোনো শ্রেণি নেই, যেমন কোনো সমাজ নেই। থাকতে পারে কেবল রূপকথায়। মার্কসের পরে ইতিহাসের ধারণা কেবল রাজা-বাদশাদের ঝগড়া-বিবাদ, কিংবা বংশানুক্রমে সীমাবদ্ধ নেই। তা প্রসারিত হয়ে গেছে জনগণের সমষ্টিগত জীবন-যাপন পর্যন্ত, যে জন্য অর্থনীতি, শিল্পকলা, দর্শন- সবই ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে পড়ে। ভেতরে থাকে শ্রেণির সঙ্গে শ্রেণির দ্বন্দ্ব, যার নাম রাজনীতি। মানুষ শ্রেণিতে বাস করে। শ্রেণি বাস করে মানুষের ইতিহাসে। 
যাকে আমরা সংস্কৃতি বলি সে-যেহেতু সম্পূর্ণত মানবিক, তাই তাকে থাকতে হয় শ্রেণিতে এবং শ্রেণিতে থাকার দরুন ইতিহাসেও। সংস্কৃতি জিনিসটা কী? সংস্কৃতির একটা নান্দনিক পরিচয় আছে। সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র সবই তার অন্তর্গত সেই অর্থে। কিন্তু সংস্কৃতি বলতে আরও কিছু বোঝায়। বোঝায় এদের অন্তর্গত আদর্শও, যা নাকি এদের সৃষ্টির অভ্যন্তরে কেবল কার্যকর নয়; রূপের মধ্যেও প্রতিফলিত। তবু সংজ্ঞা বোধ করি পূর্ণ হলো না। যথার্থ অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে ব্যাপক অর্থে, যাকে পরিবেশ বলি তার সঙ্গে মানুষের সংগ্রামের অভিব্যক্তি।
সংস্কৃতিরও মূল লক্ষ্য স্বাধীনতা। প্রয়োজনের জগৎ থেকে স্বাধীনতার জগতে উত্তরণের জন্যই মানুষ সংগ্রাম করে। যে স্বাধীনতা শ্রেণি ও ইতিহাস খর্ব করে দেয়; নষ্টও করে ফেলে, সেই স্বাধীনতা মানুষ অর্জন করতে চায় আত্মসমর্পণ করে নয় (যা পশুরা করে); দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে। যেখানে এই দ্বন্দ্বটা নেই, সংস্কৃতি সেখানে অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে- বুঝতে হবে। 
পরিবেশের সঙ্গে মানুষের যে দ্বন্দ্ব তার প্রধান মানবিক উপাদান হচ্ছে শ্রম। শ্রম থেকেই সমস্ত কিছু উৎপন্ন; সংস্কৃতি তো বটেই। এই উৎস থেকে সংস্কৃতি যখন সরে যায়, শ্রম থাকে না, দ্বন্দ্বও থাকে না। সংস্কৃতি কেবলি অলস শ্রেণির নির্জলা বিনোদনের বস্তুতে পরিণত হয় তখন তার প্রাণশক্তি বিনষ্ট হয়ে যায়। বাসি ফলের যে দশা, এই সংস্কৃতিরও অবিকল সেই দশা হয়। অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের একটি সংস্কৃতি জীবন্ত থাকে বটে, কিন্তু সে যেহেতু ওই অধিপতি শ্রেণির দ্বারা শাসিত হয়, তাই তার মধ্যেও সৌন্দর্য যেটুকু থাকে তা অন্তর্হিত হয়ে যেতে চায়। বিশেষ করে আমাদের মতে, সাম্রাজ্যবাদ-কবলিত পশ্চাৎপদ পুঁজিবাদী দেশে অপসংস্কৃতির আরও এক বড় উৎস হচ্ছে পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ। সম্পর্কটা দ্বান্দ্বিক থাকে না; বশ্যতার হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের দেশে বাংলা ভাষা কেন চলে না; শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি পায় না; লোকসংস্কৃতি কেন পণ্য হয়ে বিক্রি হয়, নয়তো অবজ্ঞায় শুকিয়ে মরে; সামন্তবাদী পিছুটান ও ভাববাদী কুসংস্কারগুলো কেন দুর্মর আঠার মতো লেগে থাকে। এসবের ব্যাখ্যা ওখানেই পাওয়া যাবে।
সমস্ত ব্যাপারটি এমনই গলিত যে, এর অস্তিত্বে কোথাও কোনো নতুন সৃষ্টি নেই, কেবল একটা কুৎসিত গ্লানি রয়েছে। এর মধ্যে একটা ষড়যন্ত্রও থাকে, সেটা হলো বিদ্যমান শোষণ-ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখার। বাংলাদেশের সমাজে সর্বত্র আজ যে উচ্ছৃঙ্খলতা ও মাস্তানি, বন্ধ্যত্ব ও হতাশা; মানুষ যে একই সঙ্গে দিশেহারা ও ক্ষুব্ধ। তার কারণ সংস্কৃতির দৈন্য-দশাতেও পাওয়া যাবে, যে দীনতায় গোটা ব্যবস্থা আবার সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। 
সংস্কৃতির ব্যাখ্যা তাই ইতিহাস ও শ্রেণির নিরিখে করাটাই সংগত। বাংলাদেশের অধিপতি শ্রেণির চরিত্র ও উৎপাদন পদ্ধতিতে এর অবসানই বলে দেবে এ দেশের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কী ঘটছে ও কেন ঘটছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য অভিন্ন, অবিভাজ্য জাতীয় সংস্কৃতি না খুঁজে শ্রেণি সংস্কৃতির অনুসন্ধানেই অধিকতর বাস্তবিক ও বিজ্ঞতার পরিচয় দেওয়া হবে। বুর্জোয়ারা যে রাষ্ট্রকে এমনকি বুর্জোয়া-পদ্ধতিতেও শাসন করতে অক্ষম- তা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। একটি বড় প্রমাণ পাকিস্তান আমলে তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেও বারবার সামরিক শাসনের প্রবর্তন। সামরিক শাসন এলে প্রথমেই যা আক্রান্ত হয়, সে হলো জনগণের মৌলিক অধিকার। অর্থাৎ স্বাধীনতা। তখন সংস্কৃতি যদি কদর্যরূপে স্থূল হয়ে পড়ে তবে তাতে বিস্মিত হবো কেন?
এর থেকে উত্তরণের উপায়টা কী? উপায় গণতন্ত্র। বুর্জোয়ারা বলবেন বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কথা। বলুন। কিন্তু বলবেন তো, সেই গণতন্ত্র আসবে কোন পথে। বলবেন, আসবে নির্বাচনের পথে। আসা উচিত, তবে আসবে কি? বাংলাদেশে কয়েকবার নির্বাচন হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনেই মাস্তানরা তৎপর ছিল। কিন্তু গত ক'টি নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় সেবক এবং মাস্তানরা যে খেলা দেখিয়েছে, তার তুলনা বিশ্বের অন্যান্য দেশে তো বটেই, আমাদের এই 'সোনার' বাংলাদেশেও পাওয়া মুশকিল। জনগণ তাদের রায় দেওয়ার কোনো সুযোগই পায়নি। দুর্বৃত্তরা তাদের রায়কে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে। 
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়