সংকটাপন্ন রোগী পরিবহন করিবার নিমিত্তে প্রতিবেশী ভারত গত বৎসর শতাধিক বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স বাংলাদেশকে উপহার দিয়াছিল। কিন্তু মঙ্গলবার সমকালের একাধিক প্রতিবেদনে যেমনটা লেখা হইয়াছে, সেই অ্যাম্বুলেন্সগুলির অধিকাংশেরই খোদ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অযত্ন-অবহেলায় থাকিয়া অচল হইবার দশা। কতক স্থানে তো মূল্যবান অ্যাম্বুলেন্সগুলিকে উন্মুক্ত স্থানে ফেলিয়া রাখা হইয়াছে। এইরূপ অনাদরে থাকিয়া নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউ ব্যবস্থা সংবলিত অ্যাম্বুলেন্সগুলির কোনোটির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি বিকল হইয়াছে; কোনোটির যন্ত্রপাতি তৎ-পরিণতি পাইবার পথে। স্বল্প কয়েকটা অ্যাম্বুলেন্স সচল থাকিলেও সেইগুলির যথার্থ ব্যবহারেও খুব একটা উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাইতেছে না। প্রতিবেদন অনুসারে, সেইগুলি কালেভদ্রে নিছক সাধারণ রোগী বহনে ব্যবহূত হইতেছে। উল্লেখ্য, ১৬৩ কোটি টাকা মূল্যের অ্যাম্বুলেন্সগুলি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশকে উপহারস্বরূপ প্রদান করা হইয়াছিল। এমন উপহারের এতটা অনাদর সত্যই দুঃখজনক।
বিষয়টি এমন নহে, অত্যাধুনিক সুবিধা সংবলিত 'লাইফ সাপোর্ট' অ্যাম্বুলেন্স আমাদিগের প্রয়োজন নাই। বিশেষায়িত এমন অ্যাম্বুলেন্স কতটা জরুরি; আমরা তাহা করোনা মহামারিকালে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করিয়াছি। তৎকালে সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে সংকটাপন্ন রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় অক্সিজেন বা অন্য সাপোর্টের অভাবে অনেক রোগীকেই বেঘোরে প্রাণ হারাইতে দেখিয়াছি। ঐ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আইসিইউ-সমৃদ্ধ অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দিয়া বেশ রমরমা ব্যবসায় করিতেও দেখা গিয়াছিল। ফলে আন্তরিকতা থাকিলে ভারতের দেওয়া অ্যাম্বুলেন্সগুলির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হইবার কোনো কারণ থাকিতে পারে না। সরকারি হাসপাতালগুলিতে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ভার স্বল্প বলিয়া সাধারণ মানুষ উহার ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল্য তাহাদিগের নাগালের বাহিরে থাকায় অনেকে তথায় যাইবার কথা চিন্তাও করে না। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সরকারি হাসপাতালগুলিতে মানুষ সেবা পাইয়াও থাকে। কিন্তু তথায় সেবা পাইবার ক্ষেত্রে যে রূপ ভোগান্তি পোহাইতে হয়, তাহা সর্বজনবিদিত। এই সকল হাসপাতালের চিকিৎসক ও অন্য কর্মচারী অনেকের আন্তরিকতা লইয়াও প্রশ্ন বিস্তর। বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সগুলির এই করুণ পরিণতি সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করিতেছে।
সংশ্নিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসমূহ আলোচ্য অ্যাম্বুলেন্সগুলির করুণ অবস্থার জন্য যে প্রয়োজনীয় নীতিমালার অনুপস্থিতির পাশাপাশি জ্বালানি বরাদ্দে জটিলতা ও জনবল সংকটকে দায়ী করিতেছে, উহাও খুব শক্ত যুক্তি বলা যায় না। দেশের অন্যান্য জেলার কথা বাদ দিলেও রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলিতে যে ১১টি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হইয়াছিল, সেইগুলির মধ্যে প্রায় দেড় বছরে মাত্র চারটি ব্যবহারে আসা আমাদিগের বিস্মিত হইবার জন্য যথেষ্ট। আমরা জানি, সমগ্র দেশ হইতে জটিল সব রোগী রাজধানীতে সেবাপ্রাপ্তির জন্য আসিয়া থাকে। রোগীর ভিড়ে যথাযথ সেবাদান অনেক সময় দুরূহ হইয়া পড়ে। এই সকল রোগীর মধ্যে কাহারও আইসিইউ সমৃদ্ধ অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন পড়ে নাই- তাহা অবিশ্বাস্য। রোগীর প্রয়োজন হইবার পরও কেন অ্যাম্বুলেন্সগুলি ব্যবহার করা যায় নাই? সরকারি হাসপাতালগুলি তো জনগণের অর্থেই পরিচালিত। জনবল সংকট কিংবা বরাদ্দের কথা বলিয়া এমন সেবা চালু না রাখা একেবারেই অযৌক্তিক।
প্রতিবেশী দেশের তরফ হইতে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ যে উপহার দেওয়া হইয়াছে; জনগণকে সেবা দেওয়ার মাধ্যমেই উহার সদ্ব্যবহার জরুরি ছিল। অথচ সেই উপহার লইয়া দেশে যাহা ঘটিয়াছে, তাহা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। অস্বীকার করা যাইবে না, বিশেষায়িত ওই অ্যাম্বুলেন্সগুলি বিশেষ মুহূর্তেই ব্যবহার করা হইয়া থাকে। কর্র্তৃপক্ষ উপহারগুলি হস্তগত হইবার পর হইতেই যদি গুরুত্বের সঙ্গে লইয়া প্রয়োজনীয় জনবল ও বরাদ্দ দিত, তাহা হইলে মানুষ যেমন সেবা পাইত, তেমনি বন্ধুত্বের মর্যাদাও রক্ষা পাইত। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলির পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বহীনতাও এড়াইবার অবকাশ নাই। তবে সুযোগ একেবারেই শেষ হইয়া যায় নাই। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য বিভাগ তৎপর হইয়া সংশ্নিষ্ট সকল হাসপাতালকে নির্দেশ দিলে গুরুত্বপূর্ণ এই অ্যাম্বুলেন্সগুলি জনসেবায় তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখিতে সক্ষম হইবে।

বিষয় : অপচয় সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন