বি জয়ের অর্ধশতাব্দী পর এসেও আমার কাছে দুটি জিনিস খুব তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। এক, আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে জন্মেছি, তারা স্বাধীনতা বিষয়টি ঠিক ততটা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি না, যতটা তাঁরা পারেন, যাঁদের দুটি অভিজ্ঞতাই আছে। একটি পরাধীন রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা; অন্যটি সেই পরাধীন রাষ্ট্রের কঠিন শৃঙ্খল ভাঙতে ভয়ানক এক যুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের অভিজ্ঞতা।
যে পাখি জন্ম থেকেই আকাশে ওড়ার স্বাধীনতা পায়, সে কখনও খাঁচায় বন্দি পাখির যন্ত্রণা বুঝতে পারে না। আর খাঁচায় বন্দি পাখি যখন আকাশে উড়তে পারে, তখন তার কাছে স্বাধীনতা অপার্থিব এক আনন্দের অনুভূতি। তার ওই অনুভূতি কিংবা আনন্দের সঙ্গে জগতের আর কিছুই তুল্য নয়। ফলে সে জানে, এই স্বাধীনতার মূল্য কী? ঠিক কতটা যত্নে, কতটা ভালোবাসায় একে আগলে রাখতে হবে।
কথাটি বলার কারণ এই যে, আমরা যারা এই প্রজন্মের, তাদের কাছ থেকে এই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাপ্তি ঠিক কতটুকু? এই প্রাপ্তি যে শুধু বস্তুগত সাফল্যের নিরিখে পরিমাপযোগ্য, তা নয়। বরং দায়বদ্ধতা, অনুভব ও ধারণ করার জায়গা থেকে আমরা ঠিক কতটুকু তার প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি? যে লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তার ঠিক কতটুকু বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পেরেছি আমরা?
এই প্রশ্ন কিংবা আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি। জরুরি এই কারণে যে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে স্বাধীনতার সত্যিকারের উপলব্ধি, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার অনুভূতি ছড়িয়ে দেওয়া এবং ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় ভবিষ্যতের পথে আলো ফেলে এগিয়ে যাওয়াটাই আমাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে সত্যি করবে। কিন্তু সেটি আমরা করতে পারছি কিনা?
চারপাশে তুমুল অস্থিরতা। ব্যক্তিগত থেকে জাতীয়, সব পরিসরেই আমাদের ভাবনা যেন এই- যে কোনো মূল্যে শুধু 'ইন্ডিভিজুয়াল'কে এগিয়ে যেতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষতি করতেও যেন আমাদের কারও কোনো দ্বিধা নেই।
এই যে বোধের বিপর্যয়; দেশের চেয়ে ব্যক্তি বড়- এই ভাবনা ঠিক কী করে এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত একটি দেশের মানুষের প্রধান ভাবনা হয়ে উঠল? আমরা কি তবে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনতার অনুভূতি উপলব্ধি করতে কিংবা করাতে ব্যর্থ হচ্ছি? আর তা যদি হয়, তবে কেন? দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, পরাধীনতা নানান আঙ্গিকে হতে পারে। সেটি শুধু ভূখণ্ডগত পরাধীনতাই নয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রেও তার নাগরিকরা নানাভাবে পরাধীনতা অনুভব করতে পারে। সেটি তাকে সত্যিকারের স্বাধীনতার অনুভূতি কিংবা আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে। তার ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক পরিসরে তাকে অবরুদ্ধ নাগরিকের অনভূতি দিতে পারে। এটি ক্রমাগত তার ভেতরে এক ধরনের অনাস্থা তৈরি করে। সেই অনাস্থা হয়তো দেশের চেয়েও তাকে অনেক বেশি ব্যক্তিক করে তোলে। সে তখন সামগ্রিকের একজন না হয়ে নিজেকে ভাবতে থাকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা। এটি খুব গুরুতর বিষয়। কারণ নবীন প্রজন্ম, যারা আক্ষরিক অর্থেই ভূখণ্ডগত পরাধীন রাষ্ট্রের কাঠামোতে বেড়ে ওঠেনি; তারা তখন এই নতুন ব্যবস্থায় নানাভাবে রুদ্ধতা অনুভব করতে থাকে। সেটি কথা বলার থেকে শুরু করে ভাবনার স্বাধীনতা অবধি বিস্তৃত।


মানুষের জীবিকা নির্বাহ থেকে শুরু করে মৃত্যুর প্রক্রিয়া অবধি বিস্তৃত এটি। এর সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য, চিকিৎসা, পেশা এমনকি গভীর রাতে নির্বিঘ্নে একা ঘরে ফেরার নিশ্চয়তাও যুক্ত। সমস্যা হচ্ছে, এই নিশ্চয়তা যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন মানুষ স্বাধীনতাটাকে ঠিক তার আরাধ্য স্বাধীনতা হিসেবে ভাবতে বা অনুভব করতে পারে না। তার শুধু মনে হতে থাকে- আমি কোথাও না কোথাও রুদ্ধ কিংবা স্বাধীন নই। এই উপলব্ধি তাকে রাষ্ট্র থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করে ব্যক্তিক করে তুলতে থাকে। সে তখন রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়েও নিজের লাভ-লোকসান, হিসাব-নিকাশ ও স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিতে থাকে। তাকে আইসোলেটেড ইন্ডিভিজুয়ালে পরিণত করতে থাকে।
তো এই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিক সত্তার সংখ্যা যত বাড়তে থাকে, তত আমরা আমাদের সেই সামগ্রিক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যেতে থাকি। হয়ে উঠতে থাকি
আত্মকেন্দ্রিক 'আমি', যা দেশ ও তার জনগণকে একে অপরের থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করতে থাকে।
এই বিজয়ের মাসে আমরা নানান ধরনের উদযাপন করি। দেশের প্রতি ভালোবাসা নিবেদন করি। কিন্তু সেই ভালোবাসা আমরা ঠিক কতটুকু আমাদের কাজে প্রমাণ করি, কতটুকু গভীর অন্তরঙ্গতায় অনুভব করি- এই ভাবনাটি নিঃসন্দেহে জরুরি। বরং অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই সময়ে বিশ্বব্যাপী নানান অস্থিরতা শুরু হয়েছে। প্রতিটি দেশই চরম বৈশ্বিক মন্দায় বিপর্যস্ত কিংবা শঙ্কাগ্রস্ত। এই সময়ে আমাদের মতো দেশের জন্য সত্যিকার অর্থেই একটি চরম অগ্নিপরীক্ষার সময়। একটি স্বাধীন দেশের মানুষ হিসেবে এই সময়ে আমাদের পারস্পরিক ঐক্য, সহযোগিতা, দেশের প্রতি নিবেদন সবচেয়ে জরুরি। অথচ তা কি হচ্ছে?
ক্রমাগত টাকা পাচারের ঘটনা শুনে আসা আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম সাম্প্রতিক ইসলামী ব্যাংকের ঘটনায়। যখন কিনা দেশের প্রতিটি মানুষ ভয়ানক আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে- কী হয়, কী হবে! বিশ্বব্যাপী নানাবিধ সতর্কবার্তা, ঠিক সেই মুহূর্তে এমন ঘটনা যে বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করায়; যে আয়নায় মুখ দেখায়; সেই বাস্তবতা অস্বীকার করার চেয়ে বড় আত্মঘাতী কাজ আর কিছু নেই। এ মূলত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করার শামিল।
আমাদের বরং এই ভাবনার গভীরে যেতে হবে। কী করে এমন অনেক বিষয়ই 'সিস্টেমে' পরিণত হলো, সেটি খুঁজে বের করতে হবে। একটি স্বাধীন দেশ কেন সে দেশের মানুষের কাছে নিজের অসততা ও ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারল না, তার শিকড় সন্ধান জরুরি। তাহলে কি আমরা সেই খাঁচায় বন্দি পাখিটি নই বলেই অসীম স্বাধীনতার আকাশে ডানা মেলে ওড়ার আনন্দ উপলব্ধি করতে পারছি না? নাকি স্বাধীনতার সত্যিকারের আনন্দ আমাদের যাপিত জীবন থেকে বহু দূরে?
এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াতেই হবে। খুঁজতে হবে উত্তর। তারপর তা ছড়িয়ে দিতে হবে পরস্পরের অনুভবে।
কারণ, স্বাধীনতার সত্যিকারের অনুভূতি মানুষকে এবং দেশকে ভালোবাসতে শেখায়। ব্যক্তির চেয়ে সামগ্রিকের স্বার্থ সেখানে বড় হয়ে ওঠে। বিজয়ের মাসে প্রত্যাশা সেটিই- যেন ব্যক্তিগত স্বার্থ, অসততা, অন্যায় প্রাপ্তির ঊর্ধ্বে উঠে আমরা দেশকে ভালোবাসতে পারি। হয়ে উঠতে পারি একজন সত্যিকারের বাংলাদেশি। যার মন ও মননে, ভাবনা ও উপলব্ধিতে গভীর সংবেদনে অনুরণন তুলতে থাকবে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ; মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ ও শপথ...।
সাদাত হোসাইন: কথাসাহিত্যিক