বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলার নাগরিক হিসেবে আমরা গর্বিত। তাঁরই নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বুঝতে শেখার পর থেকেই আমরা স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে শুরু করেছি। ক্ষমতার পালাবদলে ইতিহাস বদলে যেতেও দেখেছি।

স্বাধীন দেশে বিভাজনও সৃষ্টি হয়েছে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে। পক্ষ-বিপক্ষের কথা এ জন্যই বলা। এখনও দুই ভাগে ভাগ হচ্ছে জনগণ। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি ও বিপক্ষ শক্তি খুঁজে নিতেই আমাদের অনেক ভাবতে হচ্ছে।

স্বাধীনতা মানে শুধু পরাধীন দেশকে মুক্ত করা নয়। স্বাধীনতা মানে দেশের সার্বিক উন্নতি-অগ্রগতি সমুন্নত রাখা। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, হানাহানি, লুটতরাজ নিয়ন্ত্রণ করা। বঙ্গবন্ধু সে লক্ষ্যেই বাঙালিকে আহ্বান করেছিলেন ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে। স্বাধীন দেশে রাজনীতি মানে যাচ্ছেতাই করা নয়। সব নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, ভোটাধিকার, কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করা। ইতিহাস মুছে দেওয়ার পাঁয়তারা নয়; সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা। সর্বোপরি জনগণকে অর্থনৈতিক মুক্তি দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

যতবার দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেছে, ততবারই দুর্নীতি নামের ব্যাধি আমাদের পশ্চাতে টেনে নিয়ে গেছে। তাই এখন দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়াও স্বাধীনতা অর্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ। এই দুর্নীতিতে ব্যক্তিরাই লাভবান হচ্ছে। ব্যাংক উজাড় হয়ে যাচ্ছে। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে যাচ্ছে। তখন মনে হয়, 'রাষ্ট্রের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়'- এ নীতিতে সবকিছু নির্ধারিত হচ্ছে। যুগে যুগে দেশের সার্বিক কল্যাণের কথা বলতে গেলেও বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। দেশ ছাড়ার হুমকি এসেছে। স্বদেশে প্রত্যাবর্তনে বাধা দেওয়া হয়েছে। সেখানেও ব্যক্তির দাপট প্রকট হয়ে উঠেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'আমার দেখা নয়া চীন' বইয়ে দেখতে পাই, চীন দেশটি মাত্র কয়েক বছরে আমূল পরিবর্তন সাধন করেছে। সরকার ও জনগণ মিলে দেশটিকে আমূল বদলে দিয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি, দেহব্যবসা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে। ছেলে অপরাধ করলে বাবা; স্বামী অন্যায় করলে স্ত্রী তুলে দিয়েছেন প্রশাসনের হাতে। এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হয়তো এমন উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলেন। নিলেও কি তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল? স্বাধীন দেশেও স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন করতে হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি ও অর্থ কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা আমাদের এগোতে দেয়নি। ফলে এখন পর্যন্ত বেকারত্ব নিরসন সম্ভব হয়নি। শিক্ষার হার বাড়লেও কর্মসংস্থানের অভাবে বেশিরভাগ তরুণ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।

সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা আমরা কি প্রণয়ন করতে পেরেছি? তাই এমবিবিএস পাস করে অনেকেই প্রশাসন ক্যাডারে চলে যাচ্ছেন। বুয়েটে পড়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিসিএসকে। গত ৫০ বছরে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে নানাজন নানা কথা বললেও মানোন্নয়ন ঠিক কতটুকু হয়েছে, তা শিক্ষার্থীরাই ভালো বলতে পারবেন। শিক্ষার অন্তরায় হয়ে উঠেছে ছাত্র রাজনীতি। অথচ স্বাধীনতার আগে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে ছাত্ররাই ছিলেন সোচ্চার। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেও মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এখন নৈতিক শিক্ষার অভাব। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনরা ছাত্রদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। সঠিক নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে খুবই কম।

দ্বিধাহীন চিত্তে স্বীকার করছি, দেশের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। ৫০ বছর পর বহু কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু হয়েছে। একযোগে ১০০ সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। জনগণের জীবনমান উন্নত হয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে কি বেড়েছে সেবার মান?

১৯৭৫ সালের ১০ জানুয়ারি পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে দিকনির্দেশনামূলক এবং আবেগঘন সেই ভাষণ শুধু মুখে নয়, হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'সমস্ত সরকারি কর্মচারীকেই আমি অনুরোধ করি, যাদের অর্থে আমাদের সংসার চলে, তাদের সেবা করুন। যাদের জন্য, যাদের অর্থে আজকে আমরা চলছি, তাদের যাতে কষ্ট না হয়, তার দিকে খেয়াল রাখুন। যারা অন্যায় করবে, আপনারা অবশ্যই তাদের কঠোর হস্তে দমন করবেন। কিন্তু সাবধান- একটা নিরপরাধ লোকের ওপরও যেন অত্যাচার না হয়। তাতে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠবে। আপনারা সেই দিকে খেয়াল রাখবেন। আপনারা যদি অত্যাচার করেন, শেষ পর্যন্ত আমাকেও আল্লাহর কাছে তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কারণ আমি আপনাদের নেতা। আমারও সেখানে দায়িত্ব রয়েছে। আপনাদের প্রত্যেকটি কাজের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমার ঘাড়ে চাপে, আমার সহকর্মীদের ঘাড়ে চাপে। এ জন্য আপনাদের কাছে আমার আবেদন রইল, আমার অনুরোধ রইল, আমার আদেশ রইল- আপনারা মানুষের সেবা করুন। মানুষের সেবার মতো শান্তি দুনিয়ার আর কিছুতে হয় না। একটা গরিব যদি হাত তুলে আপনাকে দোয়া করে, আল্লাহ সেটা কবুল করে নেন।'

এই সেবার ব্যাপ্তি কিন্তু অনেক। প্রজাতন্ত্রের সব দপ্তরকে তা নিশ্চিত করতে হবে। অথচ এখনও নিশ্চিত করা যায়নি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা। অব্যবস্থাপনায় অকালেই ধ্বংস হচ্ছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। হত্যা, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ, মারামারি, লুটপাট দিন দিন যেন বাড়ছেই। সম্প্রতি গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দেখা দিয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি।

এ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন ঘটাতে পারলেই প্রকৃত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারব। ৫০ বছরে বিশ্বের বুকে যতটা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি, সেই সঙ্গে উন্নত দেশের কাতারেও নিজের দেশকে দাঁড় করাতে পারব।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী