ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শুক্রবার গাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হইয়া এক নারীর মৃত্যু আমাদিগকে যেইরূপ বেদনাহত, সেইরূপ বিক্ষুব্ধও করিয়াছে। এই অঘটন কেবল ইহাই প্রমাণ করিতেছে না যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা অনিরাপদ; বরং ইহাও প্রমাণ করিতেছে যে, কেউ কেউ কতটা অমানুষ হইতে পারেন! শনিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এলাকায় প্রাইভেটকারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী এক নারী রাস্তায় ছিটকাইয়া পড়েন। ইহার পরও গাড়ি না থামাইয়া প্রাইভেটকারচালক তাঁহাকে নীলক্ষেত পর্যন্ত টানিয়া লইয়া যান। অবশেষে স্থানীয়রা ধাওয়া করিয়া গাড়িটিকে থামাইয়া গুরুতর অবস্থায় ওই নারীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লইয়া যাওয়ার পর তাঁহার মৃত্যু ঘটে। অবস্থাদৃষ্টে ইহা যতখানি না দুর্ঘটনা, তাহার চাইতে বেশি হত্যাকাণ্ড হিসাবেই প্রতিভাত হয়। আরও হতাশার বিষয়, প্রাইভেটকারটির চালক কোনও অপ্রশিক্ষিত চালক নহেন; বরং উচ্চশিক্ষিত একজন ব্যক্তি যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতাকালে চাকুরিচ্যুত হইয়াছেন।

এই অঘটনের জন্য প্রথমত উক্ত চালকই দায়ী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এলাকায় তিনি যেইভাবে গাড়িটি চালাইতেছিলেন তাহা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। তিনি মোটরসাইকেলটি ধাক্কা দিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, একই সঙ্গে উক্ত নারীকে টানিয়াই গাড়ি চালাইতেছিলেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও অন্যরা তাঁহাকে ধাওয়া করিলেও তিনি উহা থামাইবার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই। তৎক্ষণাৎ তিনি গাড়িটি থামাইলে হয়তো ভুক্তভোগী নারীকে জীবন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হইত। বিক্ষুব্ধ জনতা অবশেষে তাঁহাকে থামাইলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি তাঁহাদের রোষের শিকার হইয়াছেন। প্রশ্ন হইল, তিনি এমন বেপরোয়া হইলেন কীভাবে?

এই মর্মন্তুদ দুর্ঘটনার দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এড়াইতে পারেন না। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরিয়াই নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়িবার আন্দোলন করিতেছেন। তাঁহারা ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ এবং বাহিরের যানবাহন প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের দাবি জানাইয়া আসিলেও কর্তৃপক্ষ তাহাতে ভ্রুক্ষেপ করেন নাই। শুক্রবারের উক্ত দুর্ঘটনার পরও শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করিয়াছেন। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীদের দাবি আমলে লইয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ত্বরিত পদক্ষেপ লইতে হইবে। ক্যাম্পাসে গাড়ি প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করিবার জন্য সকল প্রবেশদ্বারে চেকপয়েন্ট থাকা যেমন অত্যাবশ্যক, তাহার চাইতেও জরুরি হইল পরিবহনের গতিসীমা নির্ধারণ করা এবং তাহা তদারকিতে পদক্ষেপ নেওয়া। অস্বীকার করা যাইবে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল আন্দোলনের সূতিকাগার। উক্ত ক্যাম্পাস ঘিরিয়া নানাবিধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হইয়া থাকে। সেই কারণে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ উক্ত সকল আয়োজনে অংশগ্রহণ করিতেই পারে। কিন্তু উক্ত এলাকায় পরিবহনের অবাধ চলাচল গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। ক্যাম্পাসের ভিতরে পরিবহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ না করিলে উক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও দুর্ঘটনার শিকার হইতে পারেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অঘটনে সড়ক পরিবহন আইনে চালককে আসামি করিয়া মামলা করা হইয়াছে। বস্তুত, প্রাইভেটকারটির চালক যেইভাবে গাড়িটি চালাইতেছিলেন তাহা আইনেরও লঙ্ঘন। শুক্রবার সাপ্তাহিক কর্মবিরতির দিবস হিসাবে রাজধানীর সড়ক অন্যান্য দিবসের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ফাঁকা থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাও বিশেষ আয়োজন ছাড়া এই সকল দিবসে যানবাহন তুলনামূলক অপ্রতুল থাকে। সতর্কতার সহিত যানবাহন চালাইলে দুর্ঘটনা ঘটিবার বিশেষ কোনো কারণ থাকিবার কথা নহে। সড়কে বেপরোয়া হইবার কোনো কারণই নাই। তাহার পরেও উক্ত চালক যেইরূপ আচরণ করিয়াছেন, তাহা ক্ষমার অযোগ্য এবং এই অপরাধে তাঁহাকে শাস্তি পাইতেই হইবে।

বলিবার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ এমনিতেই সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশ। এই অঞ্চলে সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন দুর্ঘটনার কারণে প্রায় নিত্যদিনই মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়া থাকে। সড়কে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমাদিগের চালকগণের দায়ভারও কম নহে। যাত্রীবাহী পরিবহন চালাইতে যেমন বেপরোয়া গতি ও সড়ক আইনের লঙ্ঘন হইয়া থাকে, তেমনি ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল কিংবা প্রাইভেটকার চালাইবার ক্ষেত্রেও যে নাগরিকগণের একই মনোভাব রহিয়াছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অঘটন তাহারই প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। আমাদিগের সড়ক, ক্যাম্পাস সর্বোপরি সমগ্র দেশ নিরাপদ রাখিবার ক্ষেত্রে সামষ্টিক দায়িত্বশীলতার বিকল্প নাই। আমরা বিশ্বাস করি, কর্তৃপক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উক্ত ঘটনাকে আমলে লইয়া এতদ্ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।