বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশের সিরিজ কর্মসূচির শেষ এপিসোড ঢাকা সমাবেশ নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে সমাবেশস্থলকে কেন্দ্র করে। ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশের অনুমতির জন্য বিএনপি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বরাবর আবেদন করেছিল গত ১৫ নভেম্বর। আবেদনপত্রে তারা সমাবেশস্থল হিসেবে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তার কথা উল্লেখ করেছিল। সে আবেদনের জবাবে ডিএমপি গত ২৯ নভেম্বর এক চিঠিতে বিএনপিকে সমাবেশস্থল হিসেবে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহারের কথা জানিয়ে অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে সমাবেশ করতে বিএনপিকে 'অবশ্য পালনীয়' ২৬টি শর্তও দেয়। যদিও ওই চিঠির কোনো অফিসিয়াল জবাব বিএনপি এখন পর্যন্ত দেয়নি। তবে চিঠিপ্রাপ্তির দিনই নয়াপল্টনের এক জনসভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বক্তৃতায় 'নয়াপল্টনেই সমাবেশ হবে' উল্লেখ করে সরকারকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিএনপি কেন নয়াপল্টনেই সমাবেশ করতে চায়, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা। এর কারণ তারা খোলাসা করছে না। তবে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বিএনপি ওই দিন সর্ববৃহৎ জনসমাবেশ করতে চায়। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো 'ছোট জায়গায়' তা সম্ভব নয়। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর এ মন্তব্য সচেতন মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সম্পর্কে সম্যক ধারণা টুকু সাহেবের আছে কিনা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চেয়ে নয়াপল্টনের সড়কটিতে জায়গা বেশি- এ কথা বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন কেউ বিশ্বাস করবেন না। বরং অনেকেই মনে করেন, ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশে যে সংখ্যক লোকসমাগমের কথা বিএনপি নেতারা বলছেন, তাতে নয়াপল্টনের সড়কেই সংকুলান হবে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই সে জন্য উপযুক্ত।
এদিকে সরকার কেন বিএনপিকে নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে দিতে নারাজ- তা নিয়েও ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে। সরকার সম্ভবত বিএনপির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান এবং কিছুটা চিন্তিতও। প্রচার আছে, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপি সমাবেশ করতে চাচ্ছে ওইদিন পুরো ঢাকাকে অচল করে দেওয়ার জন্য। ব্যাপক জনসমাগম ঘটিয়ে বিএনপি সেদিন 'সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত' অবস্থান কর্মসূচি দিয়ে বসতে পারে- এমন একটি গুঞ্জন ইতোমধ্যে চাউর হয়েছে। সে রকম কিছু ঘটলে সরকারের জন্য তা হবে অস্বস্তিকর। কারণ তখন সেখান থেকে বিএনপি নেতাকর্মীকে সরাতে গেলে বল প্রয়োগ করতে হবে। আর সেটা করতে গেলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তাতে সরকার পড়বে বিব্রতকর অবস্থায়।
এ ক্ষেত্রে নয়াপল্টন সড়কটির অবস্থান বিবেচনায় নিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে। এটি ঢাকার নাভিমূলে অবস্থিত একটি প্রধান সড়ক। এর সঙ্গে চারদিকে সংযুক্ত বেশ কয়েকটি প্রধান ও শাখা সড়ক। উপরন্তু ওই এলাকার আশপাশে বঙ্গভবন, সুপ্রিম কোর্ট ভবন, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং সচিবালয় অবস্থিত। নয়াপল্টকে কেন্দ্র করে ওই দিন সেসব সড়ক বিএনপি নেতাকর্মীর দখলে চলে গেলে দক্ষিণ ঢাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। সরকারের ভাবনার বিষয় হলো, বিএনপি যদি নয়াপল্টনে অবস্থান নিয়ে ফেলে, তাহলে এসব সড়ক নিমেষেই তাদের দখলে চলে যাবে। তখন শক্তি প্রয়োগ করে তাদের হটাতে গেলে যে বিশৃঙ্খলা ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হবে, তা মুহূর্তেই গোটা রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব কারণ বিবেচনা করেই সরকার সতর্কতা হেতু বিএনপিকে নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দুই দলের এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে ১০ ডিসেম্বর দেশের পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। এ বিষয়ে গত ৩ ডিসেম্বর সমকাল 'কী হবে ১০ ডিসেম্বর' শীর্ষক যে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দুই দলের শীর্ষস্থানীয় দুই নেতা যে কথা বলেছেন, তাতে তাদের আপন সিদ্ধান্তে অটল থাকার বিষয়টি স্পষ্ট। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মতলব খারাপ বলেই বিএনপি নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে চাচ্ছে। সরকার ইতিবাচক বলেই নয়াপল্টনের মতো ছোট জায়গার পরিবর্তে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো বড় পরিসরে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে। বিএনপি তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সার্বিক নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাঁরা নয়াপল্টনে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কোনো সংঘাত হলে তার দায় সরকারকে নিতে হবে। তিনি অবশ্য সরকারকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, অন্য সমাবেশগুলোর মতো এ সমাবেশও তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবেন।
বলা হয়ে থাকে, সমঝোতাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু আমাদের বড় রাজনৈতিক দল দুটি সমঝোতার পথে হাঁটতে অভ্যস্ত নয়। তারা নিজ নিজ অবস্থানে এতটাই স্থির হয়ে আছে; সেখান থেকে নড়ার আপাত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এখন প্রশ্ন- শেষ পর্যন্ত সরকার ও বিএনপির মধ্যে যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে কী ঘটতে পারে? বিএনপি যদি নয়াপল্টনেই সমাবেশ করতে চায়, তাহলে সরকার যে ছেড়ে কথা বলবে না- তা পরিস্কার। সে ক্ষেত্রে সমাবেশের এক বা দু'দিন আগে থেকেই নয়াপল্টন সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে; যার আলামত ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পাওয়া গেছে। ওইদিন বিকেলে সেখানে একটি মিছিলের পর পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীর ওপর ধরপাকড় চালিয়েছে এবং বিএনপি অফিস এলাকায় বহুসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করেছে। অনুমান করা যায়, ১০ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত পুলিশ সেখানে তৎপর থাকবে।
তাহলে এখন বিএনপি কী করতে পারে? দলটির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে কথা প্রসঙ্গে বললাম, কর্মসূচির সফল সমাপ্তি চাইলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই সমাবেশ করুন। সময়টা ইগোর নয়, কৌশলের। নয়াপল্টনের সিদ্ধান্তে গোঁ ধরে থাকলে সমাবেশই পণ্ড হয়ে যেতে পারে। বিএনপির কয়েকজন শুভানুধ্যায়ীও আমাকে বলেছেন, তাঁরা চান ঢাকায় একটি বড় সমাবেশ করে বিএনপি তার শক্তির জানান দিক। তা না করে যদি এ মুহূর্তে সরকারের সঙ্গে সংঘাতে যায় তাহলে আখেরে ক্ষতি বৈ লাভ হবে না।
মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক