মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণ দেশে প্রতি বৎসর ৮০ সহস্রাধিক নাগরিকের অকালমৃত্যুর কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে- আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের এইরূপ ভাষ্য আমাদিগকে উদ্বিগ্ন করিলেও বিস্মিত করিতেছে না। ইতোপূর্বেও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় জীবন, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে বায়ুদূষণের নেতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট হইয়াছে। চলতি বৎসরের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকিউএয়ার প্রকাশিত এক সূচকেও বিশ্বের বায়ুদূষণ তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করিয়াছিল। বস্তুত ২০১৮ সাল হইতেই এই ক্ষেত্রে আমরা শীর্ষস্থান ধরিয়া রাখিবার 'গৌরব' অর্জন করিয়া আসিতেছি। সমগ্র দেশ তো বটেই, নগরী হিসাবেও 'তিলোত্তমা' ঢাকা প্রায় প্রতি বৎসর বিশ্বের দূষিত শহরগুলির তালিকায় প্রথম কিংবা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করিয়া আসিতেছে। বিশ্বব্যাংক প্রণীত 'শ্বাসের বিপদ :বাংলাদেশে বায়ুদূষণের নূতন তথ্য-প্রমাণ ও স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব' শীর্ষক প্রতিবেদনটির ন্যায় পূর্বেকার গবেষণা ও সূচকগুলিতেও আমরা দেখিয়া আসিয়াছি, এই 'নীরব ঘাতক' কীভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ব্যতীতও জীবন-জীবিকার অন্যান্য ক্ষেত্রে ক্ষতি করিতেছে। আলোচ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে, বায়ুদূষণের কারণে ২০১৯ সালে মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপির কমবেশি ৪ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। বায়ূদূষণজনিত রোগে ও নাজুকতায় শুধু অকালমৃত্যু নহে; ইহার ফলে নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিষণ্ণতায় ভুগিবার যে চিত্র দেখা যাইতেছে, তাহাও ধর্তব্য বটে। এক্ষণে প্রশ্ন হইতেছে- এইভাবে আর কতদিন চলিবে?
স্মর্তব্য, বাংলাদেশের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য গবেষণা জরুরি নহে। নাসিকা, চক্ষু ও মুখ দিয়াই এখানকার বায়ুর 'মান' উপলব্ধি করা যাইতে পারে। বিশেষত ঢাকা মহানগরীতে নাগরিকদের সাধারণ অভিজ্ঞতাতেই ইহা প্রমাণিত- বৎসরের অধিকাংশ সময় বক্ষ পূর্ণ করিয়া শ্বাস লওয়া সম্ভব হয় না। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় সেই জনঅভিজ্ঞতাই প্রতিফলিত হইয়াছে মাত্র। স্বীকার করিতে হইবে, ঢাকা নগরী এবং ইহার উপকণ্ঠ জুড়িয়া মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন মেগা ও মাঝারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলিতেছে। আর ঢাকা ঘিরিয়া ব্যাঙের ছাতার ন্যায় গজাইয়া উঠা ইটভাটার ধূম্রদূষণ ব্যতিরেকেও বিভিন্ন শিল্পকারখানার বায়ুদূষণ রহিয়া যাইতেছে নজরদারি ও তদারকির বাহিরে। তৎসহিত বর্জ্য দগ্ধকরণ কিংবা গাড়ির কৃষ্ণধূম্রের কথাও উল্লেখযোগ্য। এতদীয় বিবেচনায় ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। কিন্তু ঢাকার বাহিরে 'সুজলা-সুফলা' বাংলাদেশ জুড়িয়াও বায়ুদূষণ পরিস্থিতির এইরূপ অবনতি হইতেছে কেন? আমরা জানি, বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে কিছু 'হটস্পট' তথা চরম দূষিত অঞ্চল থাকে সাধারণত শিল্প এলাকা বেষ্টন করিয়া। কিন্তু বৎসরের পর বৎসর বিভিন্ন গবেষণার প্রায় অভিন্ন চিত্র প্রমাণ করে- আবাসিক হইতে বাণিজ্যিক, ঘিঞ্জি হইতে অভিজাত; সকল অঞ্চলই বর্তমানে বায়ুদূষণের উষ্ণক্ষেত্র হইয়া উঠিয়াছে। বিষয়টা নিছক বায়বীয় হইতে পারে না।
বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনের তথ্যচিত্রের বাহিরে আমাদের বরং উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত এই কারণে- এতদ্‌সত্ত্বেও বায়ুদূষণ লইয়া কর্তৃপক্ষ মহাকাব্যিক নীরবতা পালন করিয়া যাইতেছে। চিকিৎসা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলিয়া আসিতেছেন, বায়ুদূষণের জের ধরিয়া নাগরিকগণের ফুসফুস ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রোগ ও ঝুঁকির মুখে পড়িতেছে। স্মরণ করা যাইতে পারে, গত বৎসর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের অপর এক গবেষণা প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হইয়াছিল, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু হ্রাস পাইতেছে প্রায় পাঁচ বৎসর চার মাস। আরও উদ্বেগজনক, বায়ুদূষণজনিত রোগে দেশে কত মানুষ আক্রান্ত হইতেছে, তাহার সরকারি পরিসংখ্যানও নাই। যে দেশের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি এইরূপ, সেইখানে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই আরও সঙ্গিন হইবার কথা। তৎসহিত আমাদিগের জনঘনত্ব, পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার চিত্রও বিবেচনা করিতে হইবে বৈকি। এই সকল প্রেক্ষিত বিবেচনা করিয়া কর্তৃপক্ষের যথায় দিবস-রজনী বিনিদ্র কাটাইবার কথা, তথায় এতদ্রূপ সুখনিদ্রা কী রূপে সম্ভব? আমরা দেখিতে চাইব বিলম্বে হইলেও কর্তৃপক্ষের নিদ্রাবসান ঘটিয়াছে। আমরা দেখিয়াছি, চীনসহ বিভিন্ন দেশের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে প্রকট থাকিলেও তাহারা ইতোমধ্যে উন্নতি করিয়াছে। আমাদের প্রশ্ন- বাংলাদেশ পারিবে না কেন?

বিষয় : বায়বীয় নহে সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন