ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

মিয়ানমারে বিদ্রোহের ভূত-ভবিষ্যৎ

মিয়ানমারে বিদ্রোহের ভূত-ভবিষ্যৎ

মিয়ানমারে রাস্তায় বিদ্রোহীরা। ছবি: রয়টার্স

অশোক কে. মেহতা

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২১:৪৮ | আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২১:৫০

গত মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সীমান্তবিষয়ক সিদ্ধান্তটি বাতিল হয়েছে। তিনি মিয়ানমার সীমান্তের পুরো ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার বেড়া দিয়ে আটকে দেওয়া এবং ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম (এফএমআর) স্থগিত করার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম উভয় প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এ ধরনের পদক্ষেপ সীমান্তজুড়ে তাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিভাজন তৈরি করবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্তটি নাকচ করে দিয়েছেন। গত কয়েক মাসে দেশটির রাখাইন ও আরাকান প্রদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত সামরিক জান্তা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। জান্তা বাহিনীর যে ৮০০ সদস্য ভারতের কাছাকাছি এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মণিপুরের বিদ্রোহীরা মিয়ানমার সীমান্তে আশ্রয় গ্রহণকালে তীব্র সহিংসতাকে (গত বছরের মে থেকে) নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন। তখন মণিপুর রাজ্য অস্ত্রাগার থেকে ৬ হাজার অস্ত্র হারিয়েছিল, যা ওই সহিংসতাকে উসকে দেয়।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় মণিপুর প্রদেশ ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ যখন অব্যবস্থাপনার পরিচয় দেয়, তখন এক সময় ঘুমন্ত ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত জান্তার কাছ থেকে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের হাতে চলে যাওয়ায় বেশ চাঙ্গা ও অরক্ষিত হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক জান্তা মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে। ১৯৬২ সাল থেকে এ পর্যন্ত তারা ছয়বার সফলভাবে দেশ দখল করতে পেরেছে। পৃথিবীর অন্য যে কোনো সামরিক বাহিনীর চেয়ে বেশিসংখ্যক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তারা বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।

কিন্তু এই প্রথমবারের মতো সামরিক শাসন উৎখাত করতে জাতীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও বিদ্রোহীরা এ খেলার শেষ নিয়ে ভেবেচে বলে মনে হয় না। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশন (ইএও), স্থানীয় সশস্ত্র বাহিনী ও পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ)। পিডিএফ হলো সংখ্যাগুরু বামার জাতিগোষ্ঠী নিয়ে ন্যাশনাল লিগ অব ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) গঠিত একটা বাহিনী।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশন (ইএও) গোষ্ঠীগুলো স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে। যদিও সবাই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে শরিক হয়নি। শক্তিশালী আরাকান আর্মির (এএ) কথাই বলা যাক। এরা রাখাইন, চীন ও আরাকান প্রদেশে গত বছরের নভেম্বরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করে। শুধু তাই নয়, তারা সেসব প্রদেশে জান্তা বাহিনীকে পরাজিত করতে আক্রমণ করে।

গত মাসের শুরুতেই আরাকান বাহিনী কালাদানের তীরে অবস্থিত পালেতওয়া শহর দখল করে নেয়। শহরটি ভারতের ত্রিমুখী মহাসড়কের কেন্দ্র, যা মিয়ানমারের সেগেইং অঞ্চল দিয়ে ভারতের মোরেহ থেকে থাইল্যান্ডের মো সেট পর্যন্ত বিস্তৃত। সুতরাং রাখাইন, আরাকান প্রদেশ ও সেগেইং অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আরাকান বাহিনী দিল্লির জন্য প্রধান মধ্যস্থতাকারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারাই এসব অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই জান্তাদের ব্যাপারে দিল্লির উচিত নতুন নীতি প্রণয়ন করা।

মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের বড় পরিসরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। চীন জান্তা বাহিনীর পরাজয়ে অনুমোদন দেবে না। দেশটি রাশিয়ার সঙ্গে মিলে মিয়ানমার জান্তার জন্য সামরিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন বাড়িয়ে দেবে। এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশনের (ইএও) সাথে বেইজিংয়ের শক্ত যোগাযোগ ও তাদের ওপর বেশ প্রভাব আছে। যেমন তারা আরাকান আর্মিকে অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে। যে কোনো ধরনের দীর্ঘ রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে চীন প্রধান কর্তাস্বত্বা হয়ে থাকবে। এর কারণ কেবল এই নয়, বহিরাগত খেলোয়াড় হিসেবে চীনের আধিপত্য; বরং দেশটিতে তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে বলেই এ ধরনের প্রভাব থাকবে।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও জান্তার এই অচলাবস্থা ভাঙার কোনো ভালো পথ জানা নেই। তাদের সামনে দুটি রাস্তা খোলা আছে। ক. আসিয়ান–প্রস্তাবিত পাঁচ দফা ঐকমত্যের ভিত্তিতে আলোচনায় বসে রাজনৈতিক সমাধান আনা। অবস্থা নাজুক হওয়ায় তারা যুদ্ধ বন্ধ করতে বেশ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। সেটা সম্ভব হতে পারে কেবল শত্রুতার অবসানের পর। খ. দ্বিতীয় পছন্দ হতে পারে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশনের (ইএও) যৌথ আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দিতে যুদ্ধবিরতি চুক্তি উপেক্ষা করা। জান্তা যুদ্ধে হারতে চায় না। কারণ তখন তাদের স্থান হবে আন্তর্জাতিক কোর্ট অব জাস্টিসের কাঠগড়ায়। ২০১৯ সালে রোহিঙ্গা ও গৃহযুদ্ধে বামারদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে হেগের ওই আদালতে দেশটির জেনারেলরা এরই মধ্যে বিচারের মুখোমুখি।

অশোক কে. মেহতা, মেজর জেনারেল, তৎকালীন ডিফেন্স প্ল্যানিং স্টাফের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বর্তমানে তিনি ‘ইন্টিগ্রেটেড ডিফেন্স স্টাফ’; দ্য ওয়ার থেকে অনুবাদ করেছেন ইফতেখারুল ইসলাম

সম্পর্কিত

আরও পড়ুন

×